নিজেকে নায়ক মানতে নারাজ মাশরাফি

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৬, ১৯:১৪
চোট আর সংগ্রামের কাহিনীচিত্র রচনা করে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে এগিয়ে নিচ্ছেন মাশরাফি নামের এক নায়ক। তরুণ প্রজন্মের আদর্শই এখন মাশরাফি। কিন্তু নিজেকে নায়কের আসনে বসাতে চান না মাশরাফি নিজে। সম্প্রতি কলকাতার শীর্ষ দৈনিক আনন্দবাজারকে দেয়া সাক্ষাতকারে এমনটাই বলেন মাশরাফি।
 
আনন্দবাজারের প্রতিবেদ গৌতম ভট্টাচার্যের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,  সবচেয়ে বড় হিরো আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁদের জন্যই তো আজ স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা রয়েছি। আমি ওদের অসম্ভব সম্মান করি। আমি সম্মান করি বৈজ্ঞানিকদের। ওঁদের এক-একটা আবিষ্কার জাতিকে কত বছর আগে নিয়ে যায়। আমি সম্মান করি ডাক্তারদের। যাঁরা মানুষের জীবন বাঁচান। এর চেয়ে মহত কাজ আর কি হতে পারে। আমাদের নিয়ে যত নাচানাচিই হোক, আমরা কি কারও জীবন বাঁচাতে পারছি?
 
এমস সময় গৌতম প্রশ্ন করেন, `ক্রিকেটকে জাতীয়তাবাদের স্তম্ভ হিসেবে দেখাটা আপনি সমর্থন করেন না?
 
মাশরাফির জবাব,আমি নিজের মনের কথা বলেছি। আমি মনে করি দিনের শেষে খেলাটা একটা বিনোদন। তাও তো ক্রিকেট হল স্পোর্টসের একটা অংশ। পুরো খেলা নয়। সেখানে এত হিরো ওয়ারশিপের দরকার কি?'

মাশরাফি আরও বলেন, ‘আমি ভেতর থেকে বিশ্বাস করি আমাদের সমর্থন করছেন খুব ভাল। আমার টিম কৃতজ্ঞ। কিন্তু সেই মেয়েটিকেও করুন যে সাফ গেমসে চারটে সোনা জিতে সবার অলক্ষ্যে ঢাকা ফিরেছে। আমরা যদি স্পোর্টসের লোক হই তো ওই মেয়েটিও স্পোর্টসেরই লোক। সাপোর্ট জীবনের সব বিভাগে করুন। তা হলেই তো বাংলাদেশ এগোতে পারবে। শুধু ক্রিকেটে পড়ে থেকে কি লাভ ‘
 
ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশের উচ্ছাস নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আজকের দিনটা রেস্ট নেওয়ার জন্য রেখেছি। তা ছাড়া জিতেছি বলে উচ্ছ্বাসে ভেসে যাব কেন? জীবনে প্রচুর হেরেছি। ইদানীং কিছু ম্যাচ জিতছি। জিনিসগুলো স্বাভাবিক ভাবে নেওয়াই ভাল।’
 
তিনি বলেন, ড্রেসিংরুম অবধি খুব আনন্দ হয়ে থাকে। ব্যস ওই পর্যন্ত। এর বাইরে হোটেলে গিয়ে আর একপ্রস্ত উল্লাস। কেক কাটা এগুলো হয় না। আমরা সব ড্রেসিংরুমেই ফেলে আসি।’
 
সমর্থকদের নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা তো ক্রিকেট খেলে আমাদের দেশের জনগণকে কিছু দিতে পারিনি। দিনের পর দিন ওঁরা হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তখনও টিমে ভাল প্লেয়ার ছিল। সুমন ছিল। আশরাফুল ছিল। কিন্তু এক- দু’জন ভাল খেলত। টিমটা জিতত না। ২০০৭ ওয়ার্ল্ড কাপের ইন্ডিয়া ম্যাচটা আমরা প্রথম বড় খেলা জিতলাম। ওই ম্যাচটা যত দিন বেঁচে আছি মনে রাখব। কি কি প্লেয়ার ছিল ইন্ডিয়ার। সচিন, রাহুল, কুম্বলে, দাদা। ওই ম্যাচ থেকে আমাদের কনফিডেন্স পাওয়া শুরু। ইদানীং আমরা দেশের মাঠে কিছু জিতছি। বলতে পারেন সমর্থকদের কাছে যে ধার-কর্জ হয়েছিল তার কিছু কিছু করে ফেরত দিচ্ছি। এবার বিদেশেও ভাল খেলতে হবে।
 
গৌতম ভট্টাচার্য প্রশ্ন করেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের মধ্যে আপনার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু প্রেসবক্সেও আপনি যে সমর্থন পান ভাবা যায় না। কাল আপনার বলের গতি কমে গ্যাছে। নতুন পেসার চাই এটুকু বলায় দু’দিক দিয়ে সিনিয়র দুই সাংবাদিক ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আপনাকে ঘিরে এই সস্নেহ অনুরাগের বলয় ভাবাই যায় না। এর রহস্য কি?’
 
জবাবে মাশরাফি বলেন, আমি সচিনের একটা ইন্টারভিউ পড়েছিলাম যেখানে ও বলেছিল, ভাল ক্রিকেটার তো অনেকেই হতে পারে। ভাল। সঙ্গে ভাল মানুষ হওয়াটা অনেক ইম্পর্ট্যান্ট। আমি ওই কথাটা মনে রেখেছি। ক্রিকেট তো ক’দিনের। ভাল মানুষ হিসেবে যেন সবার মনে বেঁচে থাকতে পারি। তা বলে চোট রয়েছে, সাত বার অপারেশন হয়েছে এই সহানুভূতি নিয়ে ক্রিকেট খেলতে চাই না। আমার যেন ছোট ছোট কন্ট্রিবিউশন থাকে। কাল হাফিজের উইকেটটা। আমার দুটো বাউন্ডারি। এগুলোও থাকতে হবে।
 
ক্যাপ্টেন্সি নিয়ে মাশরাফি বলেন, ‘ক্যাপ্টেন্সির পর ঠিক করলাম ড্রেসিংরুমটাকে ঠিক রাখতে হবে। ম্যাচ বাই ম্যাচ ভাবব। একসঙ্গে অনেকটা নয়। আর জুনিয়র-সিনিয়রে কোনও গ্যাপ হতে দেব না। ইউটিউবে অনেক ক্যাপ্টেনের ইন্টারভিউ এই সময় দেখে আমি ক্যাপ্টেন্সি ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করেছি। একটা শো রয়েছে ওখানে, যেখানে ভিভিএস লক্ষ্মণ আর দাদা ৪৫ মিনিট কথা বলেছে। ওইটা শুনে আমি ঠিক করি ক্যাপ্টেন হিসেবে আমি কি ভাবে এগোব। ম্যাচ হারতে পারি কিন্তু আবেগটা যেন রিয়েল হয়। যেন সব সময় টিম সেরাটা দেয়।’
 
এশিয়া কাপের ফাইনাল নিয়ে মাশরাফি বলেন, খুব পরিষ্কার ভাবেই ভারত ফেভারিট। এটা তো র‌্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরের সঙ্গে দশ নম্বরের খেলা। আমাদের অবশ্য কনফিডেন্স আছে ভাল লড়ব। মুস্তাফিজকে মিস করছি। কাল ও থাকলে পাকিস্তান ১০০ করতে পারত না। ও থাকলে ফাইনালে অনেক সুবিধে হত। তবে লড়ব। যা হবে হবে।
 
তবে টিমকে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালের কথা বলে জাগাবেন মন্তব্য করে মাশরাফি বলেন, কোনও টিমকে চার্জ করার জন্য এই প্রতিহিংসা-টিংসা বলতে হবে আমি বিশ্বাস করি না। অবশ্যই জিততে চাই। কিন্তু তার জন্য কাউকে আঘাত করে কিছু বলতে হবে কেন? টিমকে শুধু এমন অ্যাঙ্গল থেকেই মোটিভেট করতে হবে কেন? মেলবোর্নের ওই ম্যাচের রেশ আজ আমাদের মধ্যে নেইও।