ক্রিকেটের কাণ্ডারি

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০১৬, ২৩:৪৯
 
বোলারদের বিদেশি কোচের কথা বুঝতে অসুবিধা হয়, মাশরাফি দোভাষীর কাজ করেন। টেস্ট সিরিজ হেরে দল ভেঙে পড়ে; মাশরাফি দল নিয়ে নড়াইলের চিত্রা নদীতে ঝাঁপাতে চলে যান। একজন ফার্স্ট বোলার ইনজুরিতে পড়ে আছেন; মাশরাফি হঠাত্ তার বাসায় গিয়ে হাজির—পুনর্বাসন ঠিক মতো চলছে তো! এই করে মাশরাফি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ‘ফাদার ফিগার’
...
পঞ্জিকা বলছে, এখনও ফাল্গুন মাস। তবে দুপুরের তপ্ত আকাশ, মাটি চিরে দেয়া রোদ দেখে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ বলে ভুল হয়। যত দূরে চোখ যায়, ঝলসে যেতে থাকে চোখ। গ্যালারিগুলোর পাশে একটু ছায়াই একমাত্র আশ্রয়।
 
সেই ছায়ায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের অদম্য অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। একটু দূরে দাঁড়িয়ে অনেকের সাথে এক মাঠকর্মী কিশোর মুগ্ধ হয়ে মাশরাফির কথা শুনছিলেন। হঠাত্ কথা থামিয়ে ছেলেটির হাত ধরে নিজের দিকে টান দিলেন তিনি। একটু বিরক্তিই যেন ফুটে উঠল মুখে—‘এত রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে আছ কেন? ছায়ায় থাকো।’ যেন মাশরাফি এই কিশোরেরও ছায়া হয়ে উঠতে চাইলেন।
 
মাশরাফি বিন মুর্তজা এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটেরই ছায়া হয়ে উঠেছেন। অনেক কষ্ট, অনেক দুঃসংবাদ, অনেক না পাওয়ার মধ্যে বাংলাদেশের আপামর মানুষের জন্যও ছায়ার নাম তো এখন মাশরাফি; কিংবা আমাদের ক্রিকেট দল।
 
একটা স্বল্প আয়ের কোটি কোটি মানুষের দেশ। এখানে না পাওয়ার অনেক গল্প থাকবে, এই সত্যি। কষ্ট আর বেদনার রোদ থেকে বাঁচার জন্য আমাদের খুব দরকার ছিল একটা ছায়ার। একটার পর একটা শিশু হত্যার ঘটনার মতো খবর পড়তে পড়তে হতাশ মানুষগুলোর সামনে গত বছর দেড়েক ধরে সেই ছায়াটা যেন হয়ে উঠেছে ক্রিকেট।
 
ক্রিকেটেও এই ভরসাটা একসময় ছিল না। বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলছে তো অনেক দিন ধরেই। সেই ১৯৮৬ সালে ওয়ানডে খেলা শুরু করেছে। কিন্তু দেশটা প্রথম উত্সবের উপলক্ষ খুঁজে পেল এসে ১৯৯৭ সালে। আইসিসি ট্রফি জয় করে আকরাম খানরা দেশের কোটি মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে আনলেন। সেই দেশ কাঁপানো উত্সব মিলিয়ে যেতে সময় লাগল না। এরপর ১৯৯৯ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে গিয়ে পাকিস্তানকে হারানো। তারপর দীর্ঘ দীর্ঘ বিরতি। একটা জয়ের সন্ধানে ঘুরেছে বাংলাদেশ। ২০০৫ বা ২০০৬ সালের দিকে কিছু জয়, ২০০৮ বা ২০১০ সালে অল্প বিস্তর ধারাবাহিকতা দেখা গেল বটে। কিন্তু যে প্রতাপের সন্ধানে সমর্থকরা দিন গোনেন, তার দেখা মেলে না। দিনশেষে বাংলাদেশের একটা জয় তাই ‘অঘটন’ হয়েই থাকে। এর মধ্যে এলো ২০১৪ সাল। আধুনিক যুগে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য দুর্বিষহ একটা বছর—পরাজয়ের পর পরাজয়।
 
আর এই বৃত্ত থেকে বের করে দলকে একটু স্বস্তি দিতেই ২০১৪ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের সীমিত ওভারের দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হলো ২০০৯ সালেই ‘ফুরিয়ে যাওয়া অধিনায়ক’ মাশরাফি বিন মুর্তজাকে। মাশরাফি এসে কী কী করলেন, সে কথা এতক্ষণে সবার মুখস্থ হয়ে যাওয়ার কথা।
 
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা। এরপর দেশের মাটিতে টানা পাঁচটা ওয়ানডে সিরিজ জয়; যার মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা ছিল। আর সবচেয়ে তাজ্জব ঘটনা হলো, নিজেদের দুর্বলতম জায়গা, টি-টোয়েন্টিতেই পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে এশিয়া কাপের ফাইনালে ওঠা। এখন ট্রফির অপেক্ষায় আছে মাশরাফির দল।
 
তবে আমরা দেখতে পাই, অধিনায়ক হয়ে মাশরাফির এই যে সব আপাত অবিশ্বাস্য কীর্তি, এর বীজ কিন্তু তিনি বুনতে শুরু করেছিলেন অনেক অনেক আগেই। কদিন আগে ‘মাশরাফি’ নামে তার জীবনীগ্রন্থ উন্মোচনের অনুষ্ঠানে দলের আরেক ভরসা মাহমুদউল্লাহ বলছিলেন, ‘২০০৯ সালে মাশরাফি ভাই অধিনায়ক হয়েই দলের সবাইকে একটা খামে করে দুই লাইনের চিঠি দিয়েছিলেন। সবার জন্য আলাদা আলাদা চিঠি ছিল। আর আমার ওই চিঠিটাই আমাকে বদলে দিয়েছে।’
 
মাশরাফি এই দফায় অধিনায়ক হওয়ার আগে অনেক কিছুই বদলে দিয়ে এসেছেন। বোলারদের বিদেশি কোচের কথা বুঝতে অসুবিধা হয়, মাশরাফি দোভাষীর কাজ করেন। টেস্ট সিরিজ হেরে দল ভেঙে পড়ে; মাশরাফি দল নিয়ে নড়াইলের চিত্রা নদীতে ঝাঁপাতে চলে যান। একজন ফাস্ট বোলার ইনজুরিতে পড়ে আছেন; মাশরাফি হঠাত্ তার বাসায় গিয়ে হাজির—পুনর্বাসন ঠিক মতো চলছে তো! এই করে মাশরাফি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশ দলের ‘ফাদার ফিগার’; যত না নেতা, তার চেয়ে বেশি পিতৃতুল্য অভিভাবক।
 
মাশরাফি তাসকিন-সৌম্যদের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, ক্যাচ পড়লে ক্ষিপ্ত হন, রসিকতার সময়ে সবচেয়ে আমুদে লোক হয়ে ওঠেন। নিশ্চিত করেন সাকিব, তামিম, মুশফিক, রিয়াদের শ্রদ্ধার সাথে দলে থাকা। ফলে এই বাংলাদেশ এক অন্য রকম দল হয়ে ওঠে। একে আপনি ঠিক একটা ক্রিকেট দল দিয়ে বুঝতে পারবেন না।
 
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে বুঝতে গেলে আপনাকে পরিবার বুঝতে হবে; যৌথ পরিবার। বাংলাদেশকে হারাতে গেলে আপনার কৌশল খুঁজে লাভ নেই; পরিবারের দুর্বলতা খুঁজতে হবে। কিন্তু মজাটা এই যে বাংলাদেশ নামের এই পরিবারে ফাটল নেই। সে শব্দটা  যেন অভিধান থেকেই হারিয়ে গেছে!