সম্প্রতি গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার বা ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এ প্রতিবেদনকে ইঙ্গিত করে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ে সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ বলেন, দেশ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ এক বছরে পাচার হয়েছে বলে জেনেছি। কিন্তু এ অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কোন ধরণের ব্যবস্থা নেয়ার কথা শুনি না।
শনিবার রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে এক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সততা নিশ্চিত করতে না পারলে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলে কোন ফল আসবে না। এ সময় অর্থপাচারের কৌশল হিসেবে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি কিংবা রপ্তানি, হুন্ডির মত বিষয় উঠে আসে। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজস রয়েছে বলে মন্তব্য করেন মাতলুব আহমাদ।
শুদ্ধাচার নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতের ভূমিকা শীর্ষক ওই সেমিনারের আয়োজন করে রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এতে সরকারি কর্মকর্তা ও বেসরকারি খাতের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, কিছু সংখ্যক অসৎ লোকের জন্য সৎ ব্যবসায়ীসহ সবাইকে দায় দেয়া ঠিক নয়। শুধু বেসরকারি খাত সৎ হলেই হবে না একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদেরও সৎ ও আন্তরিক হতে হবে। কিছু ব্যবসায়ী হঠাৎ অনেক অর্থের মালিক কীভাবে হলেন তা বিচার না করেই তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করার সমালোচনাও করেন ব্যবসায়ী নেতারা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ অটো রিরোলিং মিল মালিক সমিতির সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, এই দেশে বিশাল ঘুষ বাণিজ্য আছে। অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ দেশে থাকছে না। মূলত ২০০৮ সালের অতঙ্কের কারণে কেউ এখন আর দেশে টাকা রাখতে চাচ্ছেন না। প্রসঙ্গত, আলোচ্য সময়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এ সময় মাতলুব আহমাদ বলেন, এনবিআরের প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মামলায় আটকে আছে। আর ব্যাংকিং খাতের ৫২ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ হিসেবে আছে। এ দু’টি বড় ক্যান্সার নিয়ে একটি দেশ এগুতে পারে না। সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ তার মোট ঋণের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। শুদ্ধাচার নিশ্চিত করতে হলে নিজেদের আগে সৎ হবে হবে।
মাতলুব আহমাদ বলেন, ৬৪ হাজার ক্ষুদ্র দোকান প্যাকেজ ভ্যাটের তালিকাভুক্ত। কিন্তু এনবিআরের হিসাবে ভ্যাট দেয় মাত্র ৪ হাজার। ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞেস করি, কারণ কী? তারা বলেন, কর্মকর্তাদেরও টাকা দিতে হয়।
আগামী জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হচ্ছে। নতুন আইনের বিভিন্ন ইতিবাচক দিক তুলে ধরে আইনটি কার্যকর হলে ফাঁকির সুযোগ অনেক কমে যাবে বলে উল্লেখ করেছেন এনবিআর সদস্য ব্যরিস্টার জাহাঙ্গীর হোসেন।
তিনি বলেন, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন শুরু হলে ব্যবসায়ীদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, মিথ্যা ঘোষণা কিংবা অর্থপাচারের সুযোগ কমে যাবে। এ সময় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এনবিআরের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন তিনি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জাপানের সহযোগিতা সংস্থা জাইকা এ সেমিনার আয়োজনে সহায়তা করে। এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান।
এ সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম, বাংলাদেশে জাইকার প্রধান মিকিও হাতাইদা, গার্মেন্টস এক্সেসরিজ উৎপাদকদের সংগঠন বিজিএএমইএ’র সভাপতি রাফেজ আলম চৌধুরী, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মহব্বত উল্লাহ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। মূল প্রবন্ধে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব আবু সালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রের অংশ হিসেবে সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
