ক্রিকেট ঘোরের একটা দিন

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৬, ০৯:৫৫
সকলের মাঠে আসার গল্পটা মনিরুল ইসলামের মতো মসৃণ নয়। অনেকেই টানা দুই দিন, রাত ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট পাননি। অনেকে মাসের হাত খরচের সবটা টাকা ব্যয় করে কালোবাজার থেকে কিনেছেন টিকিট। অনেকে অনেক কষ্টে একে ওকে ধরে একটা সোনার হরিণের মতো টিকিট জোগাড় করেছেন। তবে দিনশেষে এই হাজারো মানুষ একটা জায়গায় এক—এসেছেন স্বপ্ন জয় দেখতে।
 
আর্জেন্টিনার হাতে ফুটবল ট্রফি, এশিয়া কাপ ফাইনালের টিকিট এবং মিটারে যেতে রাজি সিএনজি; এসবের দেখা অনন্তকাল অপেক্ষার পরও নাকি মেলে না!
 
এসব কথা শুনলেও গতকাল রাস্তায় নেমেই মনে হলো ভুল, সবই ভুল।
 
সিএনজি চালক একবাক্যে মিটারে যেতে রাজি। একটু অবাক হয়ে কারণ জিজ্ঞেস করলে, গলায় ঝোলানো অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডটা দেখিয়ে দিলেন, ‘খেলায় যাচ্ছেন না? আপনাকে কী করে কষ্ট দেই! যান, দলটারে জিতায়ে আইসেন।’
 
এই ছিলো বাংলাদেশের অবস্থা।
 
সারা বাংলাদেশ এক জ্বরে ভুগছিলো। এ জ্বর, এমনই জ্বর, যাতে মানুষ অসুস্থ হয় না। একটা ঘোর তৈরি হয়, একটা স্বপ্ন তৈরি হয়; একটা প্রতিজ্ঞা তৈরি হয়। স্বপ্নের, প্রতিজ্ঞার সেই জ্বরের নাম—এশিয়া কাপ ফাইনাল।
 
ষোলো কোটি মানুষের দেশে মাত্র হাজার তিরিশেক মানুষ হয়তো খুব টেনে টুনে মাঠে ঢুকতে পেরেছেন। তারাই বন্যার মতো, স্রোতের মতো ঢুকেছেন, ঢোকার জন্য লড়াই করেছেন মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে। আর যারা ঢুকতে পারেননি, সেই কোটি কোটি মানুষ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে টেলিভিশন কিংবা জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন।
 
দুপুরে বাসা থেকে বের হতেই বোঝা গেলো, জ্বরের উত্তাপটা থার্মোমিটারের দাগ ছাড়িয়ে গেছে।
 
দিনটা রবিবার। হিসেবমতো সপ্তাহের সবচেয়ে ব্যস্ত দিন। দুইদিন বন্ধ থাকার পর সরকারি অফিস, ব্যাংক, বীমা, স্কুল-কলেজে খুলেছে। রাস্তায় থাকার কথা প্রবল জ্যাম। কিন্তু বিস্ময়করভাবে বেশিরভাগ রাস্তাই ফাঁকা। মজার ব্যাপার হলো, শহরের কেন্দ্রগুলো থেকে বের হওয়ার রাস্তায় আবার বেশ জ্যাম আছে। মানে, দুপুর গড়াতে না গড়াতেই বাড়ি ফেরার তাড়া। গাড়ি হু হু করে ছুটছে। চোখ বুজে বলে দেয়া যায়, এসব গাড়িতে সওয়ার হওয়া লোকদের গন্তব্য বাসার ড্রইংরুম; টিভির সামনে।
 
দোকানপাট সারি সারি যেভাবে তালাবদ্ধ হয়ে আছে, তাতে সন্দেহ হলো—হরতাল টরতাল নয় তো!
 
আর এই সবকিছুর সেরা প্রতীক হয়ে উঠলো মিরপুর। শেরে বাংলা স্টেডিয়ামটা অবস্থানগতভাবে মিরপুর দুই নম্বর এলাকায়; আর কার্যত এটা দশ নম্বর গোল চত্বরের পাশেই। দশ নম্বর গোরচত্বরের বহু আগে গাড়ি থমকে যাচ্ছে। আর সামনে এগোনোর উপায় নেই। মাঠে ঢুকতে চাওয়া হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে আর এগোনো সম্ভব না। ভিড় ঠেলে এগোতে এগোতে হঠাত্ চোখ পড়লো মনিরুল ইসলামের দিকে।
 
ষাটোর্ধ্ব মানুষ। শ্মশ্রুমন্ডিত মুখ, মাথায় একটা পতাকা জড়ানো, এক হাতে এক শিশুকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। কাছে গিয়ে পরিচয় আর আশার উদ্দেশ্য জেনেও জানার চেষ্টা করতে হাফাতে হাফাতেই বললেন, ‘সেই মুক্তিযুদ্ধে দেশের জন্য স্বাধীনতা এনেছি। আর তো তেমন করে কিছু পাই নাই; এটা ক্রিকেট ট্রফি পাওয়ার সাক্ষী যদি হতে পারি। তাই নাতিকে নিয়ে চলে এসেছি।’
 
সকলে মাঠে আসার গল্পটা মনিরুল ইসলামের মতো মসৃণ নয়। অনেকেই টানা দুই দিন, রাত ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট পাননি। অনেকে মাসের হাত খরচের সবটা টাকা ব্যয় করে কালোবাজার থেকে কিনেছেন টিকিট। অনেকে অনেক কষ্টে একে ওকে ধরে একটা সোনার হরিণের মতো টিকিট জোগাড় করেছেন। তবে দিনশেষে এই হাজারো মানুষ একটা জায়গায় এক—এসেছেন স্বপ্ন জয় দেখতে।
 
যত লোক দুপুর থেকে স্টেডিয়ামের চারপাশে অবস্থান নিলেন, ততো লোক ঠাঁই দিতে তিন-চারটে স্টেডিয়ামেও কুলাবে কি না, সন্দেহ আছে। সাড়ে সাতটায় ম্যাচ; পাঁচটার একটু আগে একটা একটা করে গ্যালারি খুলে দেয়া হলো। আস্তে আস্তে ভরে উঠতে থাকলো সবুজ, ছাই রংয়ের চেয়ারগুলো। বিজ্ঞাপনী একটা সংস্থার বিলোনো টি-শার্টের সুবাদে সে জার্সি হয়ে উঠলো একটু কমলা রঙয়ের।
 
এই রঙ অবশ্য কিছুই বোঝাতে পারে না। এই রঙ দেখে অনুমান করারও উপায় নেই, সারাটা দেশ এখন আসলে লাল-সবুজ হয়ে গেছে। এ এক অন্যরকম লাল-সবুজের দিন।