ছোট দলের বড় কষ্ট

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৬, ১২:০০
চার বছর আগের কথা। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল নেদারল্যান্ডস। সে সময় কত গল্প হয়েছে, কত শত ‘রোমান্টিক’ কথা লেখা হয়েছে এই ডাচদের নিয়ে। তারপর সবার স্মৃতি থেকে যেন হারিয়েই গেছে ইউরোপের এই দলটি। চার বছর ধরে বড় কোনো দলের বিপক্ষে খেলা নেই। 
 
আইসিসির সহযোগী ছোট ছোট দেশের সাথে খেলে নিজেদের প্রস্তুত করেছে নেদারল্যান্ডস। কঠোর পরিশ্রম করে খেলতে এসেছিল আরেকটা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে; পেয়েছিল আরেকবার ‘বড়দের’ সাথে খেলার সুযোগ। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! বাংলাদেশের সঙ্গে দুটো বাজে ওভারেই শেষ হয়ে যায় নেদারল্যান্ডসের আরও কিছু বড় ম্যাচ খেলার স্বপ্ন। প্রথম ম্যাচে হারের পর দ্বিতীয় ম্যাচটিও ভেসে গেছে বৃষ্টিতে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আজ আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটাও ভেসে যেতে পারে বৃষ্টিতে। তাই যদি হয়, তাহলে চার বছর অপেক্ষার পর ৩৫.৫ ওভারের এক খেলার ভেতর দিয়েই শেষ হয়ে যাবে ডাচদের স্বপ্ন।
 
শুধু নেদারল্যান্ডস নয়, এমন করেই স্বপ্ন শেষ হয়ে যাচ্ছে আয়ারল্যান্ড, ওমান, হংকং, আরব আমিরাত কিংবা নেপালেরও। এই স্বপ্নভঙ্গের আশঙ্কা নিয়ে পথ চলছে জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তান কিংবা এক সময়ের প্রতাপশালী কেনিয়া বা কানাডার মতো ক্রিকেট দলও। একদিকে আইসিসি বগল বাজিয়ে বলছে, তারা ক্রিকেটের বিশ্বায়ন করতে চাচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্বকাপের মতো আসরগুলোতে দলের সংখ্যা কমিয়ে, ছোট দলগুলোর সাথে বড় দলগুলোর সিরিজ কার্যত বন্ধ করে দিয়ে এবং বাজেট কাটছাঁট করে শেষ করে দিচ্ছে ক্রিকেট নামের খেলাটিতে প্রতিটি দলের টিকে থাকার সম্ভাবনা।
 
২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপ থেকে রানরেটে পিছিয়ে পড়ে ছিটকে গিয়েছিল আয়ারল্যান্ড। তখনই সংবাদ সম্মেলনে কেঁদে ফেলে ছোট দলগুলোর জন্য আরো কিছু ম্যাচ বাড়ানোর দাবি করেছিলেন উইলিয়াম পোর্টারফিল্ড। রাহুল দ্রাবিড়, শচীন টেন্ডুলকার থেকে শুরু করে অনেক মহারথীকে স্পর্শ করেছিলো সেই কান্না। সবাই বলেছিলেন, এই দলগুলোর বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ বাড়ানো দরকার; বিশ্বকাপকে আর ছোট করা চলবে না। বলেছিলেন, বড় দলগুলোর বিপক্ষে বছরে কিছু অন্তত ম্যাচ তাদের পাওয়া উচিত।
 
তবে সে সব কথায় কোনো কাজ হয়নি। তার প্রমাণ, এতোদিন পর সেই একই কান্না নিয়ে এবার সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন নেদারল্যান্ডসের অধিনায়ক পিটার বোরেন। একটা ম্যাচ, আসলে দুটো বাজে ওভারে কিভাবে চার বছরের স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়, বলতে গিয়ে বোরেন বলছিলেন, ‘আমরা সবাই খুব কষ্ট পেয়েছি। ছেলেরা এই লম্বা সময় ধরে অনেক পরিশ্রম করেছে। গত এক বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে ক্যাম্প করছি আমরা। বাংলাদেশের বিপক্ষে দুটো বাজে ওভারে আমাদের সব খেলার সুযোগ শেষ হয়ে গেলো। আমরা জানি না, আবার কবে বড় কোনো দলের বিপক্ষে খেলতে পারবো।’
 
বোরেন খুব দৃঢ়তার সঙ্গেই বললেন, আইসিসি মুখে যাই বলুক, এভাবে চলতে থাকলে এই ছোট দলগুলোর ক্রিকেট খুব দ্রুতই কেনিয়ার মতো হয়ে যাবে।  প্রসঙ্গত, ১৯৯৭ বা ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত কেনিয়া ছিলো বাংলাদেশের সমানে সমান একটা দল। টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে যাওয়া বাংলাদেশ অনেক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়ে আজ পরাশক্তি। অন্যদিকে কেনিয়ার নাম মুছেই গেছে প্রায়।
 
ডাচ অধিনায়কের মতে তাদের টাকা নেই, টাকা আয় করার সামর্থ্যও নেই। তবে আইসিসি টাকা ব্যয় না করলে তারা শেষ হয়ে যাবেন। বললেন, ‘আমরা অবশ্যই যথেষ্ট খেলতে পারছি না। আমি তাদের (আইসিসিকে) বলবো, আমরা বেশি টাকা চাই না। আমরা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন দেখি না। আপনাদের ছোট একটা লাভের অংশই আমাদের অনেক। আমরা জানি, আমরা আপনাদের টাকা আয়ের উত্স হতে পারবো না। কিন্তু খেলাটাকে ছড়িয়ে দিতে চাইলে, টাকাও ছড়িয়ে দিন। তিনটি দেশের হাতে নয়, আটটা টেস্ট খেলুড়ে দেশ নয়, এমনকি দশ-বারোটা দেশকেও নয়; সকল সহযোগী ও স্বীকৃত ক্রিকেট দলের কাছে টাকা পৌঁছে দিন। তারা আরও খেলার আয়োজন করুক। দয়া করে খেলার সুযোগ দিন।’
 
বোরেনের এই কাতর আকুতি সাংবাদিকদের আর্দ্র করেছে, আরও একবার বিজ্ঞদের চোখে পানি এনেছে। কিন্তু বাস্তবতাটা বোঝেন সেই পোর্টারফিল্ড। এক বছর আগে এমন করেই মিনতি করেছিলেন আরও কিছু খেলা চেয়ে। আজ বোরেনও তারই উদ্ধৃতি ব্যবহার করে সেই একই কথা বলেছেন, ‘কোনো কাজ হবে না; এসব কথা বলে কোনো লাভ নেই। আইসিসি যেভাবে খেলা আর দল কমানোর চেষ্টা করছে, সেটা একটা বৈশ্বিক লজ্জা।’