জাকির হোসেন রোডের কষ্ট

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৬, ১১:২২
পুরো বাংলাদেশ যেনো আলোর নগরী হয়ে উঠেছিলো।
 
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সরকারি ভবনগুলোতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আলোকসজ্জা করা হয়েছিলো। ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবনগুলোতেও আলোর ছড়াছড়ি। এই এতোশত আলোর মধ্যে রাজধানীর জাকির হোসেন রোডে ঢুকেই মনে হলো, এই রাস্তাটা একটু ম্লান হয়ে আছে।
 
সিটি করপোরেশনের খোঁড়াখুঁড়ি চলছে বলে লোকজন, গাড়ি-ঘোড়ার চলাচল নেই। যে দু-চারজন লোক এখানে-ওখানে বসে আছেন, তারাও মুখ কালো করে আস্তে আস্তে কথা বলছেন।
 
গভীর রাতের এই জাকির হোসেন রোড দেখে খুব প্রতীকী বলে মনে হলো। মনে হলো, এই রাস্তার সবচেয়ে খ্যাতিমান সন্তানটির দুঃখে কাতর বুঝি পুরো এলাকা!
 
হ্যাঁ, তাসকিন আহমেদের কথা বলছিলাম। 
 
তাসকিন অবশ্য এই কাতরতা উড়িয়ে দিতে চাইলেন। কয়েক দিন পরই ২১ বছরে পা দিতে যাওয়া তাসকিন দারুণ পরিণত ভঙ্গিতে বললেন, ‘দাদা, সবকিছুকে পার্ট অব গেম হিসেবে দেখি। আগে হলে হয়তো অনেক কষ্ট পেতাম। এখন বুঝি, এসব নিয়েই এগোতে হবে। আর আমার কষ্ট অনেক কমে গেছে মানুষের রিঅ্যাকশন দেখে। এতো মানুষ, এতো সাপোর্ট করেছেন! বিশ্বাস করেন, আমি কল্পনাও করতে পারিনি, মানুষ আমাকে এতো ভালোবাসে।’
 
এমনিতে একটু মুখচোরা ধরনের ছেলে। কিন্তু কথা বলতে শুরু করলে অনেক গল্প আছে তার কাছে বলার জন্য। মানুষের সমর্থনের কথা বলতে গিয়ে চলে এলো কোচ হাতুরুসিংহে, অধিনায়ক মাশরাফি এবং সর্বোপরি বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের কথা। কোচ ও সভাপতির সমর্থনটা তাসকিনকে বিষ্মিত করেছে। আর মাশরাফির এই আবেগটা যেন ছোট ভাইয়ের পাওনাই ছিলো, ‘ভাই (মাশরাফি) তো সবাইকে আপন ভাইয়ের মতো দেখে। আর আমি তো আজকাল ট্যুরে ভাইয়ের রুমে থাকি। উনি যে কষ্ট পাবে, এমন করবে, এটা আমি বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু কোচ আর বোর্ড প্রেসিডেন্ট এমন করে বলবেন, আমি কল্পনা করিনি।’
 
অবশ্য এই বিষয়ে কথা বেশি আর এগোতে চাচ্ছিলেন না। বার বার মনটা খারাপ হয়ে যায় বোলিং অ্যাকশন কাণ্ডের এসব কথাবার্তা তুললে।
 
এর মধ্যে এক ঝলক বাতাসের মতো বড় বোনের বাসা থেকে বেড়িয়ে ফিরে এলো ছোট্ট বোনটা। জান্নাতুল আলম রোজা এসে পৌঁছাতেই পরিবেশ অনেক হালকা হয়ে গেলো। বাবা-মায়ের মুখেও হাসি। তাসকিনকে নিয়ে কিছু মজা, কিছু আজগুবি পরিকল্পনা, ছোটবেলার গল্প, খুনসুটি এবং ক্রিকেটের আলাপ।
 
ক্রিকেটের আলাপ উঠতেই তাসকিনের মুখটা আরেকবার কালো হয়ে গেলো, ‘খুব কষ্ট পেয়েছি।’
 
কষ্ট তো অনেকগুলো পেয়েছেন। সুপার টেনে ওঠার পর সবগুলো ম্যাচ হেরেছে বাংলাদেশ। শেষ ম্যাচে নিজেদের টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের সবচেয়ে কম, ৭০ রানে অলআউট হয়েছে দল। তবে এসব কষ্ট ছাপিয়ে তাসকিনের কাছে প্রধান কষ্ট ভারতের বিপক্ষে ১ রানের ওই হার।
 
সেই হারটা হোটেলে একা একা বসে দেখেছিলেন। বলতে বলতে ঘেমে উঠছিলেন, ‘আমি ভাবছিলাম, প্রথম ইনিংসটা দেখে একটু বের হবো হোটেল থেকে। একা একা খেলা দেখতে ভালো লাগে না। কিন্তু এতো সুন্দর বল করলো সবাই, টিভির সামনে থেকে উঠতে পারলাম না। শেষ ওভারে এসে আমার হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছিলো। মাঠে থেকে কোনোদিন এতো নার্ভাস লাগেনি। মুশফিক ভাই দুটো চার মারলো, আমি চিত্কার শুরু করে দিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ তিনটে বলে কী যে হলো! এই আফসোস জীবনেও যাবে না।’
 
তাসকিন ফেসবুকের বেশ ভালো অনুসরণকারী। তাই জানেন, ওই তিনটে বল তার সিনিয়র দুই সতীর্থকে কেমন ‘ভিলেন’ বানিয়ে ফেলেছে। এটা নিয়ে খুব আফসোস বাংলাদেশি এই ফাস্ট বোলারের। মাথাটা নেড়ে বললেন, ‘দেখেন রিয়াদ ভাই আর মুশফিক ভাই আমাদের কতো ম্যাচ জিতিয়েছে। ওনারাই সেদিন এই জেতার মতো জায়গায় এনেছে। ওই সময়ে কী করতে হয়, তা আমাদের চেয়ে ওনারা ভালো বোঝেন। কিন্তু হয়নি। জীবনে সব তো চাওয়া মতো হয় না। ওনারা চেষ্টা করেছেন, পারেননি। ওনাদের দোষ দেবেন না।’
 
জীবন নিয়ে এই বোধটা তাসকিনকে শক্ত করছে। নিজেই বলছেন, গত কয়েক মাসে তার সাথে যা হচ্ছে, তিনি মানুষ হিসেবে আরও পরিণত হয়ে উঠছেন। হয়তো এই দুঃসময়ের এটাই প্রাপ্তি, ‘দেখেন গত বছর খানেকে বার বার ইনজুরিতে পড়লাম, ফর্ম ফিরে পেলেই একটা না একটা ঝামেলা। এতে আর কিছু না হোক, আমি বুঝতে পারছি, জীবন সহজ না। আমি এখন অনেক কিছুর জন্য প্রস্তুত থাকতে পারি। আমি নিশ্চিত এই ধাক্কা কাটিয়ে আবার যখন ফিরবো, আগের চেয়ে শক্ত তাসকিন হয়ে ফিরবো।’