ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের সদস্যপদ প্রত্যাহারের (ব্রেক্সিট) গণরায়ের ফলে গতকাল সোমবারও পাউন্ডের অবমূল্যায়ন হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ব পুঁজিবাজারেও দরপতন অব্যাহত রয়েছে। ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে বৃটেনের অর্থনীতিতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তাতে দেশটির অর্থনীতি মন্দায় পড়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
গতকাল বিশ্বের বড় বড় স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর তথ্যে দেখা গেছে, ব্রেক্সিটের ফলে বেশিরভাগ পুঁজিবাজারেই দরপতন হয়েছে। বৃটেনের এফটিএসই-১০০ ইনডেক্স কমেছে দুই দশমিক ০৬ শতাংশ। এফটিএসই-২৫০ ইনডেক্স কমেছে সাড়ে ৪ শতাংশ। বৃটেনের শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বেশি পতন হয়েছে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলোর শেয়ারে।
গতকাল বার্কলের শেয়ারের দরপতন হয়েছে ১২ শতাংশ। রয়েল ব্যাংক অব স্কটল্যান্ডের দরপতন হয়েছে ২৪ শতাংশ। ইজি জেট-এর দরপতন হয়েছে ২২ শতাংশ।
এদিকে যুক্তরাজ্যের বাইরে ইউরোপের প্রায় সব দেশেই শেয়ার সূচকের পতন হয়েছে। স্টকস ইউরোপ-৬০০ ইনডেক্স কমেছে ৩ দশমিক ১০ শতাংশ। স্টকস-৬০০ ব্যাংক ইনডেক্স কমেছে ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। স্টকহোম-৩০ ইনডেক্স কমেছে ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। হেলসিংকি-২৫ ইনডেক্স কমেছে ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ। এমএসসিআই মার্কেট ইনডেক্স কমেছে শূন্য দশমিক ৮০ শতাংশ। জার্মানির ড্যাক্স সূচক কমেছে ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ফ্রান্সের সিএসি-৪০ সূচক কমেছে ২ দশমিক ১৭ শতাংশ।
ইউরোপের বাইরে এসএন্ডপি-৫০০ সূচক কমেছে ৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। মেক্সিকান বসলা সূচক কমেছে ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ব্রাজিলের বভেসপা সূচক কমেছে ২ দশমিক ৮২ শতাংশ।
ব্রেক্সিটের গণরায়ের ফলে পাউন্ট স্টার্লিংয়ের অবমূল্যায়নও অব্যাহত রয়েছে। পাউন্ড স্টার্লিংয়ের ফরেক্স লেনদেন পরস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত শুক্রবার ডলারের বিপরীতে পাউন্ডের দাম ৩১ বছরের সর্বনিম্নে নেমে আসে। সেদিন পাউন্ডের বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার ছিল ১ দশমিক ৩৬৭৯। গতকাল সোমবার দিনের শুরুতে বিনিময় হার দাঁড়ায় ১ দশমিক ৩৪৯৭। আর দিনের শেষভাগে পাউন্ডের অবমূল্যায়ন হয় ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। তখন বিনিময় হার নেমে আসে ১ দশমিক ৩১৬৮। বৃটেনের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পাউন্ডের আরো বেশি অবমূল্যায়ন হতে পারতো। তা হয়নি আশাবাদী ফরেক্স ব্যবসায়ীদের কারণে। ফরেক্স ব্যবসায়ীরা মনে করছেন পাউন্ডের যে অবমূল্যায়ন হয়েছে এরচেয়ে বেশি অবমূল্যায়ন হবে না, এজন্য তাদের অনেকে পাউন্ড কিনেছেন। তবে বৃটেনের অর্থনীতিতে যদি মন্দার পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়ে পুনরায় মন্দায় পড়ে তবে পাউন্ডের আরো অবমূল্যায়ন হওয়াটাই স্বাভাবিক।
সিআইবিসি মার্কেটস এর বিশেষজ্ঞ জেরেমি স্ট্রেচ বলেছেন, আমরা আগেই বলেছিলাম ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্তের ফলে পাউন্ডের ২০ শতাংশ পর্যন্ত অবমূল্যায়ন হতে পারে। এখন পরিস্থিতি সেদিকেই যাচ্ছে। আর শেষ পর্যন্ত তা ঠিক হলে পাউন্ডের দাম ডলারের বিপরীতে ১ দশমিক ২০ তে নেমে আসতে পারে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য এই বিশেষজ্ঞের।
ব্লুমবার্গ এবং সিএনএন মানির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রেক্সিটের পর বৃটেনের সার্বিক পরিস্থিতি এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যে, দেশটির অর্থনীতি মন্দায় পড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ব্যাংক অব আমেরিকার পরামর্শক রালফ প্রেসার বলেছেন, বৃটেনের অর্থনীতি এখন মন্দার দ্বারপ্রান্তে যেতে শুরু করেছে। এর বড় কারণ হলো দেশটিতে এক ধরনের অনিশ্চয়তামূলক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের পরিবেশে উদ্যোক্তারা তাদের বিনিয়োগ করা থেকে বিরত থাকবে।
ক্রেডিট সুইস-এর গবেষক রিক ডেভেরিল বলেছেন, বৃটেনের অর্থনীতি যে পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা থেকে বের হওয়ার কোনো উপায়ও আপাতত দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকেই অর্থনীতিতে এক ধরনের মন্দাভাব সৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া পাউন্ডের অবমূল্যায়ন হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগের পথও সংকুচিত হয়ে আসতে পারে।
