মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার চর বলাকিতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিসহ দু’ভাই নিহতের ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফের সহিংসতার আশঙ্কায় গ্রামটিতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
থমথমে অবস্থায় অনেক পরিবার গ্রাম ছেড়েছে। নিহতদের আরেক ভাই আওলাদ সরকার এখনও নিখোঁজ রয়েছে। নিহতদের লাশ নারায়ণগঞ্জ মর্গে ময়নাতদন্ত করার পর শুক্রবার বিকালে নিজ গ্রামে পৌছলে হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারনা হয়। বাদ আছর নামাজের জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এই সহিংসতার ঘটনায় এখনও কোন মামলা হয়নি। পুলিশ ইতোমধ্যে ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের জিঞ্জাসাবাদ চলছে। মূল অপরাধীদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।
IMG0
মেঘনা তীরের চরবলাকি গ্রামে এখন পুলিশ আর পুলিশ। কিন্তু গ্রামবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদিকে নিহতের স্বজনদের আহাজারি আর বুকফাটা আর্তনাথ চলছে। গ্রামটি একরকম পুরুষ শৃন্য। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত চরবলাকিতে গ্রামে সবকিছু মিলিয়ে এখন শোকের মাতম।
দেড়মাস আগে হোসেন্দী ইউপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বর নির্বাচিত হয়েছিলেন গোলাপ সরকার (৪৫)। জনপ্রতিনিধি হিসাবে জনগণের সেবা করার অনেক স্বপ্ন ছিল তার কিন্তু এখন সবই স্মৃতি। সহোদর আইয়ুব সরকারসহ (২৮) তিনি নিহত হয়েছেন প্রতিপক্ষের গুলিতে। আরেক ছোট ভাই আওলাদ এখনও নিখোঁজ। আর বাকি তিন ভাই আহত হয়ে হাসপাতালে শয্যাশায়ী। আর পুত্রদের বাচাঁতে গিয়ে বৃদ্ধ মাও আহত হয়েছেন। নিহতদের পিতা মজু সরকার ও মা মিসেস সরকারের যেন শোকর পাথর এখন। আর বোন এবং স্ত্রী সন্তানদের আহাজারি উপস্থিত কেউ চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি।
নিরীহ গ্রামবাসীরাও রক্ষা পায়নি দূবৃত্তদের হাত থেকে। আহতের নৌকার উঠিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর সহযোগিতার জন্যও নির্মমভাবে পিটিয়েছে নারীদেরকেও। এভাবে আকস্মিক গুলি ছুড়াসহ এমন নৃশংশতায় হতবাক গ্রামবাসী। সহিংসতার সময় বাড়িঘরও ভাংচুর হয়।
IMG1
গুলিবিদ্ধ ইউনুস মিয়া (৫০), রেহেনা বেগম (৪০), নবী হোসেন (৩৫), গিয়াসউদ্দিন (৫২), জহিরুল ইসলামসহ (৩৬) এখনও ৮ জন হাসপাতালে। এদের মধ্যে ইউনুস মিয়া ও তাঁর স্ত্রী রেহেনা বেগমের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
তাদেরকে শুক্রবার ঢাকার ল্যাব এইড হাসপাতালে অস্ত্রপোচারের কথা রয়েছে। আহতদের পাঁচজনকে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পরে আমিরুল (২০) ও ডালিমকে (২৫) গ্রেফতারকৃত অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয় এবং বাকি তিনজন সবুজ (১৯), ফারুক (২০) ও আলমগীরকে (২৫) আটক করে পুলিশ থানায় রাখা হয়েছে। এছাড়া শুক্রবার চরবলাকি গ্রাম থেকে শাহাবুদ্দিন (৪২) নামে একজনকে আটক করে গজারিয়া থানায় রাখা হয়েছে।
পুলিশ সুপার বিপ্লব বিজয় তালুকদার শুক্রবার দুপুরের দিকে গ্রামটি পরিদর্শনে যান। সেখানে হতাহতদের স্বজনদের সাথে এবং গ্রামবাসীদের সাথে কথা বলেন আশ্বাস দেন অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। পরিদর্শন শেষে পুলিশ সুপার জানান, আধিপত্য বিস্তার নিয়েই সর্হিংসতা বাধে। মূল অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
IMG2
ঘটনায় প্রত্যদর্শী ও আহতের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন কোম্পানিকে জমি কিনে দেওয়া, বালু মহলসহ বিভিন্ন কারণে স্থানীর প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও হোসেন্দী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন মন্টু গ্রুপের সাথে যুবলীগ নেতা নাজমুল ইসলামের গ্রুপের মধ্য দীর্ঘদিন ধরে বিবাদ চলছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার কিছু আগে ঝগড়ার এক পর্যায়ে সংঘর্ষ বাধে এবং চরম আকার ধারণ করে। নাজমুল গ্রুপ অসংখ্য গুলি ছুড়ে। নিহত দু’ভাই এবং আহতদের অধিকাংশই মন্টু পক্ষের সমর্থক। আধিপত্য বিস্তার এই সহিংসতা বাধে। সহিংসতার পর পার্শ্ববর্তী সোনরগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে গুলিবৃদ্ধ দু’ভাই চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, এই দু’ গ্রুপের সাথে বেশ কিছুদিন ধরেই বিবাদ চলে আসছিল। এমনকি গ্রামটিতে ঈদের জামাত আয়োজন নিয়ে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়। তবে আগে থেকেই যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে এই হতাহতের ঘটনা হত না।
গজারিয়া থানার ওসি মো. হেদায়াতুল ইসলাম ভূঞা জানান, নিখোঁজ আওলাদের সন্ধান চালাচ্ছে পুলিশ। সে গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে পরিবারের লোকজন জানালেও কোন হাসপাতালে পাওয়া যায়নি। সহকারী পুলিশ সুপার কায়সার রিজভী কোরায়েসী ঘটনাস্থলে পৌছে জানান, পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পরবতর্ িপরিস্থিতি মোকবেলায় পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে।
