জঙ্গিবাদ রুখতে জনগণের ঐক্য প্রয়োজন

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০১৬, ২১:৩৭
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া জঙ্গি হামলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সময়ের মতো দল-মত, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাইকে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জনগণেন ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। সেই  সঙ্গে দেশি-বিদেশি সকল চক্রান্ত নস্যাৎ করতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশ গভীর সংকটে পড়বে।
 
শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম আয়োজিত ‘জঙ্গিবাদী অপশক্তির উদ্বেগ ও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে অংশ নিয়ে তারা এ কথা বলেন।
 
জাতীয় সংলাপে অংশ নেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ওয়াকার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হাসান বাদশা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান, সাবেক সেনা প্রধান লে. জে (অব.) হারুন-অর-রশীদ, শিক্ষাবিদ ড. আনোয়ার হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মহিউদ্দিন আহমেদ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ শফিকুর রহমান, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইশফাক ইলাহী চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ম. হামিদ, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার প্রমুখ। ফোরামের সহ-সভাপতি নূরুল আলমের সভাপতিত্বে সঞ্চালনা করেন মহাসজিব হারুন হাবীব।
 
তথ্যমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময় গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলা প্রমাণ করে যারা জঙ্গি-সন্ত্রাসী তারা নামাজ না পড়ে হামলা করে, তারা মানুষরূপী দানব। তারা ইসলামের হাজার বছরের রীতি-নীতিতে বিশ্বাস করে না। এ আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের আদর্শকে ধ্বংস ও সরকারকে বিপদে ফেলা। খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তিনি যদি জামায়াত-যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্ক না রাখতেন, তাহলে বাংলাদেশ থেকে জঙ্গিবাদ অনেক আগেই দূর হত। তিনি জামাত-জঙ্গিবাদ সঙ্গ না ছেড়ে বারবার পরীক্ষায় ফেল করছেন।
 
তিনি বলেন, জঙ্গিদের সঙ্গে কোন সমঝোতা সম্ভব না। তাদেরকে নির্মূল করতে হবে, ধ্বংস করতে হবে। এর জন্য জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় সরকারের দক্ষতা রয়েছে। তবে তা আরও বাড়াতে হবে। যাতে তাৎক্ষণিকভাবে জঙ্গিদের মোকাবেলা করা যায়।
 
খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গিবাদ দমনে আমরা অবশ্যই বিদেশি সাহায্য-সহযোগিতা নেবো, কিন্তু এমন কোন সহযোগিতা নেয়া হবে না যাতে বাংলাদেশর স্বার্থ হানি হয়, সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট হয়। প্রধানমন্ত্রী দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে বলেছেন। তার নেতৃত্বেই ও তার প্রতি আস্থা রেখেই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্যের কথা বলছেন, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। তবে এর জন্য জামায়াতের সঙ্গ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আসতে হবে।
 
খুতবা বিষয়ে তিনি বলেন, সারাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের খুতবা পাঠিয়ে দেয়ার কাজ এ সপ্তাহে শেষ হবে। এরপর সরকার খুতবা মনিটরিং করবে।
 
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সিপিবি জোট করবে না, তাদের কার্যক্রমে আমাদের সমালোচনা রয়েছে। আর বিএনপির সঙ্গে বিরোধিতা রয়েছে। এখানে জাতীয় ঐক্য হওয়া সম্ভব না। তবে একযোগে রাস্তায় আন্দোলন করা যেতে পারে, যেমনটি এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় হয়েছিল। মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে ঐক্য হওয়া সম্ভব না। দলীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতার বাইরে এসে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।
 
ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, জামায়াতকে বাদ দিয়ে জঙ্গিবাদের হিসাব করা যাবে না। ইসলামী ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এদেশে জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধ করা সম্ভব না। জঙ্গি মদদে এখন আর পাকিস্তানের টাকা লাগে না। ইসলামী ব্যাংক অনেক বড় ব্যবসায়ী তৈরি করেছে, তারাই জঙ্গিবাদে অর্থায়ন করছে।
 
ড. আব্দুল মান্নান বলেন, সরকারি কর্ম কমিশনের পরীক্ষা নিতে গিয়ে দেখেছি, শতকরা ৯০ শতাংশই শিক্ষার্থী বাংলাদেশের সঠিক ইতিহাস জানে না। কারণ, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জাতীয় সঙ্গীত ও বাংলাদেশের ইতিহাস পাঠ করানো হয় না। এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা উঠে আসে, তারা জঙ্গি হওয়ার জন্য উৎকৃষ্ট হতে পারে।
 
হারুন-অর-রশীদ বলেন, জঙ্গিবাদ উত্থানের জন্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দায়ী। আর জঙ্গিবাদের উৎস ও পরিচর্যা কেন্দ্র হলো শিক্ষা ব্যবস্থা। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সবাইকে নিয়ে জঙ্গি প্রতিরোধ করতে হবে। কিন্তু তিনি তার উপায় বলেননি। সরকারকে জঙ্গি দমন করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
 
আনোয়ার হোসেন বলেন, অনেক কঠিন মূল্য দিয়ে আমাদের বোধদয় ঘটেছে। জঙ্গিরা যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তা রাজনৈতিকভাবে লড়তে হবে। শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করা প্রয়োজন। তা চিহ্নিত করতে না পারলে এ যুদ্ধে জয়লাভ করা যাবে না।
 
মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, সাত বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার ক্ষমতায় আছে, বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও বড় বড় সংগঠন থাকতেও আমরা হেরে যাচ্ছি। আমি আতঙ্কিত, কারণ যুক্তরাষ্ট্র আমাদেরকে জঙ্গিবাদ দমনে সহযোগিতা করতে চাচ্ছে। তাদের সহযোগিতা নিলেও সমস্যা, না নিলেও সমস্যা।
 
ডা. সারওয়ার আলী বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে সরকার যতটা আন্তরিক ছিল, জঙ্গিবাদকে ততটা গুরুত্ব দেয় নি। ধর্মের কটূক্তি বন্ধ করা যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, ধর্মের নামে বিদ্বেষ ছড়ানোকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
 
মোস্তফা জব্বার বলেন, বাঁশের কেল্লা নামের ৫২টি ফেসবুক পেজ, পর্নোগ্রাফি সাইটগুলো বিটিআরসি এখনও বন্ধ করতে পারে নি। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে জঙ্গিবাদ দমন করা সম্ভব না।