মাদারীপুর-গোপালগঞ্জের বিলগুলোতে নেই মিঠা পানির মাছ

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৬, ১৫:৩০
মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলা ও গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার হেক্টর আয়তনের জলাভূমি বিল বাঘিয়া এবং গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর, কাশিয়ানী ও সদর উপজেলায় প্রায় দশ হাজার আট শত নব্বই হেক্টর আয়তনের বৃহৎ জলাভূমি চান্দা বিল।
 
এ দুটি বিলের মধ্যে একসময় সরাসরি যোগাযোগ বা অখন্ডতা থাকলেও এখন শুধু মাত্র দুই-একটি খাল-নালার মাধ্যমে বিল দুটির মধ্যে সংযোগ রয়েছে। এই বিল দুটি মিঠা পানির প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদের জন্য বৃহত্তর ফরিদপুর সহ সারাদেশে এমনকি পাশবর্তী দেশেও  কম-বেশি পরিচিত। একসময় এখানকার বুকলাল দেশীয় কৈ, শিং, মাগুর, শোল, গজার, পুঁটি, খয়রা, ভেদা, বাইম, পাবদা, বেলে, রুই, কাতলসহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট বড় মাছের জন্য বিল বাঘিয়া ও চান্দা বিলের পরিচিতি ছিল খুব বেশি।
 
এই বিল দুটি থেকে উৎপাদিত মাছ শুধু এলাকার চাহিদাই মিটাচ্ছে না, এখানকার মাছ যাচ্ছে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। একসময় এখানকার বুকলাল দেশীয় কৈ, শিং, মাগুর, কোলকাতায় ছিল ব্যাপক চাহিদা। জ্যৈষ্ঠ থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত এই বিলে পানি পরিপূর্ণ থাকে তখন কয়েক হাজার মৎস্যজীবী বিভিন্ন ধরণের জাল, বড়শি, বাঁশের চাই, ঝুপী, কোচ, ভেসাল ইত্যাদি দিয়ে মৎস্য আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করছে।
 
শুষ্ক মৌসুমে এসব বিলের মধ্যে অজস্র কুয়ায় বা পুকুরে মাছ অবস্থান নেয়, তা সেচ দিয়ে কুয়া মালিকরা আহরণ করে। এই বিল দুটি থেকে শুধু কাচা মাছই ধরে বিক্রি করা হয় না, এখানকার মিঠা পানির মাছ শুকিয়ে খুবই ভালো মানের শুঁটকি তৈরি করা হয়। যার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বাংলাদেশসহ বিদেশেও।
 
কার্তিক, অগ্রাহয়ন ও পৌষ মাসে শুটকি ব্যবসায়ীরা এসব এলাকায় ভীড় করে। শুধু শুটকি মাছই নয়-প্রতিদিন অন্তত ৮/১০ ট্রাক কাঁচা ও জিয়াল মাছ ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়ে থাকে। ফলে এলাকার ব্যাংকগুলিও তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
 
সাম্প্রতিক সময়ের মৎস্য উদ্বৃত্ত এলাকা হিসাবে পরিচিত এদুটি বিল এলাকায় এখন মৎস্য ঘটতি দেখা দিয়েছে।  বিল বাঘিয়া ও চান্দা বিল থেকে মিঠা পানির এই সুস্বাদু মাছ ব্যাপকহারে দিন দিন কমে যাচ্ছে বা হারিয়ে যাচ্ছে।
 
কিছু প্রজাতির মাছ বিলুপ্তও হয়ে গেছে, কিছু প্রজাতি আছে হুমকির মুখে। মাছ কমে যাওয়া ও হারিয়ে যাবার কারণ হিসেবে জানা যায়, বিলে এখন আর আগের মত বর্ষার পানি আসে না, বিলগুলির চতুর্দিকে যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ করায় পানি চলাচল বাঁধাগ্রস্থ হয় এবং পানি পচে যায়। ফলে মাছের অবাধ বিচরণও মারাত্মকভাবে বাঁধাগ্রস্থ হওয়ার পাশাপাশি   মাছের স্বাভাবিক  প্রজনন ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। একারণে শ্রেণিভেদে মাছ আকারে ছোট হয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে মৎস্যজীবীদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তারা নানা কৌশলে বৈধ-অবৈধ যন্ত্রপাতি দিয়ে ছোট-বড় মাছ নির্বিশেষে আহরণ করছে, বৈশাখ -জ্যৈষ্ঠ মাসে অবাধে ডিমওয়ালা মাছ, মা মাছ, ছোট মাছ মেরে ফেলছে।
 
এছাড়া বিল দুটির কুয়াগুলি বারবার সেচ দিয়ে সেখান থেকে সব ধরণের মাছ আহরণ করা হচ্ছে। ফলে পরবর্তী মৌসুমে বংশ বৃদ্ধির জন্য মাছ আর তেমন থাকছে না। বিল অঞ্চলের সচেতন মহলের মতে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ডিমওয়ালা মাছ ও ছোট রেণুপোনা মাছ আহরণ বন্ধ রাখা এবং কুয়া, খাল-নালা থেকে একাধিকবার সেচ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করা হলে এখানকার প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ হয়ত বিলুপ্তির হাত থেকে রাখা পাবে।
রাজৈর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ময়েদুজ্জান ফারুক জানান, প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে চৈত্রের শেষ থেকে বৈশাখ এবং জৈষ্ঠ্য মাসের মধ্যভাগ পর্যন্ত সরকারি আর্থিক সহযোগিতা ও স্থানীয় জেলেদের সচেতন করার পাশপাশি ১৯৮৫ সালের জলাধার সংরক্ষণ আইনের প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
 
দৈনিক ইত্তেফাক/ এমএইচ