মাছুমের স্বপ্নের সারথী হোস্টপেয়ার

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৬, ১৮:০৬
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭০ দেশে ডোমেইন হোস্টিং সেবা প্রদান করছে হোস্টপেয়ার এলএলসি। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানির সাথে পার্টনারশিপ গড়েছে বাংলাদেশের এই প্রতিষ্ঠানটি।
 
ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট থেকে শুরু করে কর্পোরেট ওয়েবসাইটের জন্য ডোমেইন, ওয়েব হোস্টিং, ভার্চুয়াল সার্ভার, ডেডিকেটেড সার্ভার ও ক্লাস্টার সার্ভার সলিউশন দিচ্ছে হোস্টপেয়ার। দেশি এবং বিদেশি কর্মীদের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা কাস্টমার সাপোর্ট নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন।
 
হোস্টপেয়ার এলএলসি’র পরিচালক ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাছুমুল হক। স্বপ্ন তার অনেক দূর যাবার। কথা বলেছেন ইত্তেফাক অনলাইনের সঙ্গে
 
যেভাবে আগ্রহী হলেন
 
মাছুমুল হক স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে (ইইই) স্নাতক এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে (এমআইএস) স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাদের পরিবারে কেউ ব্যবসায়ী নন। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। তিনিও স্নাতক শেষ করে একটি বেসরকারি  গ্রুপ অব কোম্পানিতে ‘আইটি এক্সিকিউটিভ’ হিসেবে যোগ দেন।
 
মাছুমুল হক বলেন, ‘সেই সময় শাহবাগ এলাকাতে বিদেশ থেকে একটি ভ্রাম্যমাণ গাড়ি এসেছিল। গাড়িতেই দু’টি পরিবারের বাস। তারা অনেক বছর আগে তাদের দেশ ছেড়ে এসেছে। গাড়িটাই তাদের বাড়ি। দুই পরিবারের সাথে তাদের বাচ্চারাও থাকে। এই বিষয়টি আমার খুব পছন্দ হয়। তবে একটি প্রশ্ন জাগে মনে- তারা যে বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ায় তাদের ইনকাম সোর্স কী? পরে জানতে পারলাম, তারা দুজনই প্রোগ্রামার। কাজ করে অনলাইনে। যখন যে দেশে থাকে সেই দেশের বুথ থেকে অনলাইনে কাজের টাকা তোলে। এরপর থেকেই অনলাইনে কিছু করার ইচ্ছা জাগে। এমন কোনো কাজ করার ইচ্ছে- যা রিমোট এরিয়া থেকেও ম্যানেজ করা যাবে।’
 
শুরুর গল্প
 
মাছুমুল হক ২০০৭ সালে নিঝুম দ্বীপ ঘুরতে গিয়েছিলেন। নাম ও জায়গাটা এত বেশি পছন্দ হল যে, তার ইচ্ছে হল নিঝুম দ্বীপ নিয়ে একটি ওয়েবসাইট বানানোর। ওয়েবসাইট বানাতে হলে তো ডোমেইন কিনতে হবে কিন্তু ডোমেইন কিনতে হলে পেমেন্ট করতে ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড লাগবে। তার নিজের তো কোন ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড নেই। তবে অনলাইনে পরিচয় হয়েছিল রেজাউল কবির নামে এক বড় ভাইয়ের সাথে। উনি ইউএসএ থাকতেন। তখন মনের ইচ্ছার কথা জানালেন তাকে। কবির তাকে ডোমেইন কিনে দিলেন।
 
মাছুমুল হক বলেন, ‘কবির ভাইয়ের সহযোগিতায় শুরু। এরপর থেকে পরিচিত কারো ডোমেইন হোস্টিং লাগলে আমি আমার অ্যাকাউন্ট থেকে কিনে দিতাম। এভাবেই শুরু। পরে যখন ডোমেইন হোস্টিংয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে তখন skyhostbd.com থেকে সার্ভিস দিতে শুরু করি, তখন সবকিছু ম্যানুয়ালি মানেজ করা হত।’
IMG0
বাধা তো আসবেই
 
তিনি শুরুতে সবকিছু ম্যানুয়ালি ম্যানেজ করতেন। বিলিং সিস্টেমের মাধ্যমে কীভাবে অনলাইন থেকেই গ্রাহকরা ডোমেইন হোস্টিং অর্ডার করে সার্ভিস পেতে পারে সে বিষয়ে তার ধারণা খুব কম ছিল। দেশে হাতেগোনা অল্পকিছু প্রতিষ্ঠান এই সেবা দিত। তারা সবকিছু ম্যানুয়ালি ম্যানেজ করত।
 
মাছুমুল হক বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে হয়েছে গ্রাহকের কাছে থেকে পেমেন্ট দেয়া ও নেয়া নিয়ে। গ্রাহকরা ব্যাংকে গিয়ে পেমেন্ট করে ডিপোজিট করে ই-মেইলের মাধ্যমে জানাতো। তারপর তাদের সার্ভিস পেত। পেমেন্ট দেয়ার জন্য ফ্রিল্যান্সার কারো সাহায্য নিতে হত।’
তিনি আরো বলেন, ‘ওয়েব সার্ভার বিষয়ে টেকনিক্যাল স্কিল বাড়নোর প্রতিবন্ধকতা ছিল। এখন যেমন ইন্টারনেট স্পিড ভালো হবার কারণে সহজেই ভিডিও টিউটরিয়াল দেখে অনেক কিছু শেখা যায় আগে তেমনটা ছিল না। এছাড়া ব্যবসা করতে যে সব লিগ্যাল ডকুমেন্ট লাগে সেগুলো করতে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।’
 
এগিয়ে যাবার সময়...
 
মাছুমুল হক শুরুতে চাকরির পাশাপাশি সার্ভিস প্রোভাইড করতেন। বেশির ভাগ কাস্টমার আসত পরিচিত মানুষদের মাধ্যমে। চ্যাট করতে তার অনেক ভালো লাগত। অনলাইনে বিভিন্ন চ্যাট রুমে আড্ডা দেয়ার কারণে  অনেকের সাথে পরিচয় হতো। অনলাইনের বন্ধুদের রেফারেন্সে অনেক গ্রাহক পেয়েছেন তিনি।
 
মাছুমুল হক বলেন, ‘ব্লগ ও ফোরামগুলোতে অনেক আগে থেকেই অ্যাকটিভ ছিলাম। এখনকার চেয়ে আগে ব্লগ ফোরামে অনেক বেশি মানুষ ভিজিট করত। তাই সব সময়ই অনলাইনে মার্কেটিংয়ের বিষয়ে প্রধান্য দিয়েছি। সব সময়ই চেষ্টা করেছি সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগানোর। ২০১২ সালে আমি ও সালেহ আহমেদ যৌথভাবে নতুন নামে আমাদের সার্ভিসকে রিব্র্যান্ডিং করি।’
সফলতা-ব্যার্থতার গল্প
 
হোস্টপেয়ারকে (www.hostpair.com) তারা একটি ব্র্যান্ড হিসেবে ওয়েব হোস্টিং ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। বর্তমানে হোস্টপেয়ার বাংলাদেশের সেরা ডোমেইন হোস্টিং কোম্পানি হিসেবে সফলতা অর্জন করেছে। দেশ-বিদেশ মিলিয়ে ৩ হাজারেরও বেশি কাস্টমার রয়েছে তাদের। CloudLinux, cPanel, Cloudflare, Attracta এবং Softaculous এর মতো বিশ্বের নামি-দামি কোম্পানির সাথে রয়েছে ব্যবসায়িক পার্টনারশিপ।
 
মাছুমুল হক বলেন, ‘মেসের একটি রুম থেকে শুরু হয়েছিল এর যাত্রা। বর্তমানে ডিওএইচএস এবং মহাখালীতে রয়েছে নিজস্ব অফিস। বর্তমানে ৬ জন কর্মচারী সহমোট ৮ জন মিলে কোম্পানিতে কাজ করি।’
 
প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে…
 
প্রথম থেকেই অনলাইনের মাধ্যমে হোস্টপেয়ার প্রচার করে আসছে। বর্তমানে অনলাইন প্রচারণার সাথে অফলাইন প্রচারণাও চলছে। সোশ্যাল মিয়াতে প্রচারণার জন্য ফেসবুক, টুইটার, গুগল প্লাস, লিংকডইন ব্যবহার করা হয়।  বিদেশি কাস্টমার পাওয়ার জন্য ডোমেইন হোস্টিং রিলেটেড ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম গুলোতে অ্যাকটিভ থাকেন এবং প্রচারণা চালান।
 
মাছুমুল হক বলেন, ‘সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের মাধ্যমে ডোমেইন হোস্টিং রিলেটেড কিওয়ার্ড র‌্যাংক করতে পারার কারণে গুগল থেকেই আমরা অনেক ভিজিটর ও গ্রাহক পেয়ে থাকি। অফলাইন প্রচারণার জন্য কম্পিউটার ম্যাগাজিন ব্যবহার করে থাকি।’
IMG1
আগামীর চোখে...
 
হোস্টপেয়ারকে বিশ্বের নাম করা হোস্টিং প্রোভাইডার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং দেশের অর্থনীতি ও মানুষের কর্মসংস্থানে অবদান রাখাই তাদের লক্ষ্য। এগুলো অর্জনের জন্য প্রয়োজন ইনভেস্টমেন্টের। ২০১৭-২০১৮ সালে যাতে বড় ধরনের ইনভেস্ট করা যায়, সে লক্ষ্যে বর্তমানে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে কোম্পানিকে কয়েকশ’ কোটি টাকার কোম্পানিতে রূপান্তর করার স্বপ্ন দেখেন তারা।
 
নবীনের চোখে...
 
যেকোনো কিছু একাগ্রতা, সততা ও নিষ্ঠার সাথে করলে সফলতা আসবেই। এই ব্যবসায় আসার আগে ব্যবসা সম্পর্কে জেনে নিতে হবে। হোস্টিং ব্যবসায় শর্টকার্টে আয়ের কোন রাস্তা নেই। প্রচুর ধৈর্য্য, কম্পিউটার এবং টেকনিক্যাল জ্ঞান থাকতে হবে। সততা এবং পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকলে আপনি হোস্টিং ব্যবসাকে পেশা হিসেবে নিতে পারবেন। আর ঝুঁকি নেয়ার মতো মানসিকতাও থাকতে হবে।