সন্তানরা কেমন হোক বা কেমন চাই আমরা

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৬, ০৫:৪৯
 
চলে যাওয়া বা স্বেচ্ছায় নিজেদের সরিয়ে নেয়া তারুণ্যকে ফিরিয়ে আনার জন্য এখন আকুলতার শেষ নেই। এর ভেতর যতটা আন্তরিকতা ততটাই আছে ভয়। কারণ এরা এখন সমাজ, জাতি ও দেশের জন্য থ্রেট। এদের পালিয়ে যাওয়ার সময় পরিবার বা সমাজ কিছু বলেনি। জানলেও রা করেনি। কারণ একদিকে সম্মান বা জানাজানির ভয়, আরেকদিকে হয়তো ছিল প্রচ্ছন্ন ইন্ধন। তার চেয়েও জরুরি বলবো পরিবারের ভূমিকা।
 
আগে পরিবারের কোনো সন্তান লেখক, কবি, আঁকিয়ে, গাইয়ে বা এমনকি রাজনীতি করতে চাইলেও সমাজ বাধা দিতো না। গোড়ায় কারো কারো মুখ ভার বা আপত্তি থাকলেও এক সময় মেনে নিয়ে এ জন্য গর্ব করতো সবাই। এখন সবার আগে অন্ধত্ব। সবার আগে কথিত পাপ-পুণ্য। আজকাল মানুষের ড্রয়িংরুমে ঠিক হয় কে বেহেশতে যাবে আর কার জায়গা হবে নরকে। নিরীহ মা-বাবাদের ওপর অমানবিক চাপ জারি করে রেখেছে অন্ধ সমাজ। তারা জানলেও তাই বলে না। বলতে পারে না। সুকুমার বৃত্তির ওপর এত চাপ আগে দেখিনি।
 
এমন সমাজে শিশু কিশোর যুবকরা কেন ভালো দিকে যাবে? কেন তারা সংস্কৃতিতে মজবে?
 
মফস্বল স্কুলের একটি ছাত্র তার খসড়া খাতায় আঁকি-বুকি করতে গিয়ে চমত্কার একটি নারীর ছবি এঁকে ফেলেছিল। না, সেখানে কোনো কথিত অশ্লীলতার চিহ্ন ছিল না। পায়ের গোড়ালিতে নূপুর আর নাকে নাকছাবি। স্নান শেষে উঠে আসা শাশ্বত কোনো জননী বা মেয়ের ছবি। ছেলেটি তা বুঝলেও মাষ্টার মানেননি। মাষ্টারের মনে আগের সেই ভালোবাসা বা অনুভূতি নাই। তার বয়স বেড়েছে। এক সময় তারুণ্যে এই ভদ্রলোক বেশ কয়েকটা প্রেমও করেছিলেন। তখন তার উড়ন্ত যৌবন। চিঠি লেখা, পুকুরপাড়ে দেখা করা কিছুই বাদ পড়তো না। যথারীতি প্রেমের পর সামাজিক বিয়ে। জীবনে যেসব কিছু হবার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা পূর্ণ হয়নি। ঘুরতে ঘুরতে মাষ্টারিতে এসে পড়া। এককালে এই ইনি লুকিয়ে লাল বই পড়তেন। সাম্যবাদের স্বপ্ন আর বিপ্লবের জন্য বাড়ি ছেড়ে পালাতেও চেয়েছিলেন বেশ কয়েকবার। মধ্যবিত্ত পরিবারের চাপ আর মায়ায় সেটাও করে উঠতে পারেননি। যখন মাষ্টারি নিলেন তখনো ভাবতেন সমাজ বদলে দেবেন। এমন সব ছাত্র-ছাত্রী তৈরি করবেন যারা এই দেশ ও সমাজকে আলোয় ভরে তুলবে। সেই মাষ্টার মশাইয়ের আজ অন্য চেহারা। বয়সের ফাঁক গলে তার মগজে ঢুকেছে স্বর্গ-নরকের ভূত। কোনটা পাপ কোনটা পুণ্য সে চিন্তায় এখন সময় কাটে তার। বইয়ের ধরন গেছে বদলে। নিজে জীবনের অনেক কিছু তাড়িয়ে ভোগ করার পর এখন বাচ্চাদের বেলায় কঠিন। তাদের এক পা এধার-ওধার দেখলে মেজাজ খিচড়ে যায় তার। এই ছেলেটিকে তিনি অশ্লীলতার দায়ে এমনকি ছবি আঁকার দায়ে এমন শাস্তি দিতে চাইলেন যাতে তার আর পড়াশোনাই না হয়।
 
সেটা অবশ্য সম্ভব হয়নি। কিন্তু বিষয়টা কি আসলেই ব্যক্তিগত? কোনো মাষ্টারের কি এমন ভাবনা থাকা উচিত? আমাদের সময় আমরা দেখেছি টিচাররা বাড়তি কাজ বা সৃজনশীলতার জন্য প্রেরণা দিতেন। স্কুলে-স্কুলে গান-বাজনা, আঁকার প্রতিযোগিতা হতো। সে কারণেই কিন্তু এ দেশের সংস্কৃতি জীবন নিয়ন্ত্রণে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পেরেছে। আজকাল এসব বিষয়ে মাথাব্যথা নেই কারো। বড় জোর ক্রিকেট বা ফুটবল। একটি ছেলে কোটি কোটি প্রতিভার ভেতর এগারজনে চান্স পাবে না জেনেও এই অত্যাচারের শিকার।
 
অন্যদিকে সৃজন মানুষের মগজের ওষুধ। তাকে নানা প্ররোচনা থেকে দূরে রাখে। এমনিতেই এখন শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীরা ঘরের বাইরে পা রাখে না। তাদের চোখ হাত মগজের কোনো ব্যায়াম নেই। বিশ্রাম নেই। সেখানে তাদের গান আঁকা লেখার মতো কাজে বিরত রাখা মানেই তো অন্য কিছু বা উত্তেজনার দিকে ঠেলে দেয়ার কাজটি করা।
 
এমন চললে কি জঙ্গিবাদ দমন হবে? বাচ্চাদের আমরা কবি হতে দেবো না। গায়ক-গায়িকা হতে দেবো না। ছবি আঁকতে দেবো না। তবে তারা কী হবে? সারা দিনমান এক কথা এক ধ্যান এক দিকে ধাবিত করলে তারা এমন কিছু করতে উদ্বুদ্ধ হবে যে মা বাবা সরকার পুলিশ সবাই খুঁজলেও পাওয়া যাবে না। তখন বেদনা বা কান্নার নাম হবে মায়াকান্না। সেটাই কি করছি আমরা?
 
লেখক : সিডনি প্রবাসী কলামিস্ট