‘মা, বউরে কইও বাবুর জামা কিনছুইন’

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ০০:০৬
“ভাইডা মইরা গেলোরে। আগের রাইতে মার কাছে ফোন করে কইছিলো, মা, বউরে কইও বাবুর জামা কিনছুইন। শনিবার বোনাস দেওনের পর বাড়ি আইয়ুম।” এসব কথা বলতে বলতে বুক চাপড়াচ্ছিলেন বেদেনা বেগম। গতকাল টঙ্গীর ট্যাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় বিস্ফোরণের ঘটনায় বেদেনার ভাই রাশেদ নিহত হয়েছেন।
 
রাশেদ ছিলেন রিকশা চালক। প্রতিদিনের মতো ভোরে রিকশা নিয়ে ট্যাম্পাকো ফয়েলসের পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের দোলাচাপা গ্রামের বাসিন্দা রাশেদ টঙ্গির আউচপাড়ায় থেকে রিকশা চালাতেন। গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী ও তিন বছরের পুত্র সন্তান রনি থাকে। সন্তানের জন্য ঈদের জামা আগেই কিনেছিলেন। জামা কেনার খবরটি শুক্রবার রাতে মায়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলাপকালে জানিয়ে দেন। শুক্রবার যানজট থাকায় শনিবার দুপুরে বাড়ির উদ্দেশ্যে তার রওয়ানা দেয়ার কথা। কিন্তু চলে গেলেন না ফেরার দেশে। টঙ্গী ৫০ শয্যা হাসপাতালে সামনে পিতা সজিম উদ্দিন ও দুই বোন মজিদা এবং বেদানা বেগম বিলাপ করে বলছিলেন এসব কথা।
 
ট্যাম্পাকো ফয়েলস কারখানার অপারেটর মাইনুদ্দিন গতকাল সকালে কর্মক্ষেত্রে যান। ঈদে রাস্তায় যানজট। সেজন্য ঈদের পর বাড়ি যাওয়ার কথা জানিয়ে দেন তার বাবা-মাকে। শনিবার ছুটির পর কেনাকাটা করবেন স্ত্রী, সন্তান, পিতা, মাতার জন্য। দুই শিশুপুত্র নাফিস (৫) ও নাবিলকে (৩) নিয়ে বাড়িতে বাবামার সঙ্গে ্ঈদ করা কথা ছিল তার। কিন্তু সকালেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় মাইনুদ্দিনের। কর্মক্ষেত্রে বিস্ফোরণে মারা যান তিনি। স্ত্রী ও স্বজনরা হাসপাতাল থেকে তার লাশ নিতে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। মাইনুদ্দিনের ভাতিজি সুলতানা বেগম জানান, তারা মুরকুন এলাকার রাসেল মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।
 
স্ত্রী নিগার সুলতার সঙ্গে সকালে শেষ কথা হয় স্বামী প্রকৌশলী আনিসুর রহমানের। স্ত্রী সন্তানকে ঘুমের মধ্যে রেখেই সকালে ট্যাম্পাকো ফয়েলস-এ ডিউটিতে যান আনিস। হঠাত্ বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে নিগারের। বাইরে বেরিয়ে তাকিয়ে দেখেন আগুন আর ধোঁয়া বের হচ্ছে। খবর নিয়ে জানতে পারেন তার স্বামী যে কারখানায় চাকরি করেন সেখানেই এ বিষ্ফোরণ ঘটে ও আগুন লাগে। সাত বছর ধরে জেনারেটর ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ঐ প্রতিষ্ঠানে কাজ করছিলেন আনিসুর। গতকাল অফিস ছুটির পর স্ত্রী, সন্তানের জন্য ঈদের কেনাকাটা করার কথা ছিল তার। কিন্তু তার আগেই বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় তার। স্ত্রীর বুক ফাটা আর্তনাদে হাসপাতাল এলাকা ভারি হয়ে উঠে। তিনি কারখানা সংলগ্ন স্থানীয় গোপালপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।
 
“আমার পোলাডারে আমার কাছে আইনা দেন, আমি এখন কি নিয়া বাঁচমু ?” আহাজারি করে কথাগুলো বলছিলেন ৫৯ বছর বয়সি ময়মুনা খাতুন। টঙ্গীর বিসিক শিল্প নগরীর ট্যাম্পাকো নামের ঐ প্রতিষ্ঠানে মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন তার ছেলে মাহিদুল ইসলাম (২৭)। ময়মুনা খাতুন এ প্রতিনিধিকে জানান, রাতের শিফটে কাজ করার জন্য মাহিদুল কারখানায় এসেছিলো। এরপর আর ফোনেও কথা হয়নি। সকালে অগ্নিকান্ডের খবর পেয়ে তিনি কারখানার সামনে আসেন। এখন ছেলেকে হন্যে হয়ে খুঁজছেন। ছেলের ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
 
শুধু ময়মুনা খাতুন নয়, ট্যাম্পাকো কারখানায় কাজ করতেন এমন বহু কর্মীর পরিবার তাদের সন্তান, স্বজনের খোঁজে ভিড় জমাচ্ছেন ঘটনাস্থলে এবং টঙ্গী সরকারী হাসপাতাল ময়দানে। আকুতি জানাচ্ছেন সাংবাদিক, পুলিশ, ডাক্তার, বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের কাছে।
 
প্রতিষ্ঠানের মেশিন অপারেটর নাসির পাটোয়ারিকে (৫২) খুঁজতে সকাল থেকেই কারখানার সামনে অবস্থান করছিলেন ছোট ভাই মাসুম পাটোয়ারি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ভাইকে জীবিত পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছি। এখন যদি সাংবাদিকরা সাহায্য করে আমার ভাইকে খুঁজে দেন তাহলে অন্তত ভাইয়ের লাশটা দেখতে পারব।
 
ভোলা প্রতিনিধি জানান, ট্যাম্পাকো ফয়েলসে বিস্ফোরণে নিহত সিকিউরিটি ইনচার্জ জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ি ভোলা শহরের মুসলিম পাড়ায়। সেনাবাহিনীর অবসর প্রাপ্ত সৈনিক জাহাঙ্গির আলম কয়েক বছর আগে এ কারখানার সিকিউরিট ইনচার্জ হিসেবে যোগদান করেন বলে তার পরিবার সূত্রে জানা গেছে । তার স্ত্রী নিলুফার বেগম, দুই পুত্র নাদিম (১৮), নাহিম (১৪) ও কন্যা নিপা (২৪)। শনিবার সন্ধ্যায় ঈদে লঞ্চে ভোলার উদ্দেশ্যে তার রওনা দেয়ার কথা ছিল। এখন ঈদে বাড়ি আসবে জাহাঙ্গীরের লাশ।
 
 

ইত্তেফাক/এএন