‘সৈয়দ হকের মত মানুষকে বার বার চাই’

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০১৬, ১০:০৬
 
ধীর পায়ে মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন আনোয়ারা সৈয়দ হক। বললেন, ‘আমার ভেতরে অনেক অপরাধবোধের জন্ম দিয়ে চলে গেছেন। মানুষটিকে ভাল করে বুঝলাম না, ভাল করে সময় কাটালাম না। দেশের মানুষের মনেই তিনি বেঁচে থাকবেন।’ সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুর পরে একেবারেই চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। বললেন, আমি নিজের কাজ নিয়ে, নিজের লেখা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এখন সে জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে, অনুতাপ হচ্ছে। তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ ছিলেন। তিনি খুব একাকী মানুষ ছিলেন, সবসময় নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। সে জন্য তাকে অনেক সময় দূরের মানুষ মনে হতো; কিন্তু তিনি সব দিকে খেয়াল রাখতেন।
 
গতকাল শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সৈয়দ শামসুল হকের নাগরিক শোকসভার আয়োজন করে। পিতার স্মৃতিচারণে দ্বিতীয় সৈয়দ হক বললেন, বাবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল দেশের মানুষ ও সংস্কৃতি। সারাজীবন মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তার মৃত্যুর পর সেই মানুষের ঢল দেখে আমরা কৃতজ্ঞ।
 
সৈয়দ শামসুল হক প্রসঙ্গে বিশিষ্টজনেরা বলেন, তিনি মৃত্যুহীন প্রাণ। তার সৃজন আলোয় মুক্তির পথ খুঁজে নেবে আগামী প্রজন্ম। আন্দোলনে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ছিল প্রেরণামন্ত্রের মতো। শুধু লেখা দিয়েই   নয়, তিনি সশরীরে সেসব আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। মানুষের মুক্তির আন্দোলনে তিনি এবং তার লেখা মানুষকে প্রেরণা যুগিয়েছে। সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি তার সামাজিক আন্দোলনের বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রেরণা জোগাবে নতুন প্রজন্মকে।
 
শিল্পী বুলবুল ইসলামের কণ্ঠে ‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু’ এ রবীন্দ্র সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্মরণ অনুষ্ঠান। এতে স্মৃতিচারণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আআমস আরেফিন সিদ্দিক, সংসদ সদস্য র. আ. মুক্তাদির চৌধুরী, নাসিরউদ্দিন ইফসুফ, নাট্যজন আতাউর রহমান, নাট্যজন মামুনুর রশীদ, চলচ্চিত্রাভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান, সাংবাদিক আবেদ খান, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মুহাম্মদ সামাদ, কবি নাসির আহমেদ, ফকির আলমগীর, বিএসএমএমইউর উপাচার্য কামরুল হাসান খান, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি মুহাম্মদ শফিকুর রহমান, ম. হামিদ, চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলাম, মান্নান হীরা, আলম তালুকদার, হাসান আরিফ, পিএসসি চেয়রাম্যান কবি মোহাম্মদ সাদিক, কবি আসাদ মান্নান ও রেখা চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন গোলাম কুদ্দুছ। সঞ্চালনা করেন মাসকুর-এ সাত্তার কল্লোল।
 
আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যু অকালমৃত্যু বলেই মনে হয়। তিনি ছিলেন জাতির পথপ্রদর্শক। তার প্রয়োজনীয়তা কখনোই ফুরাবার নয়। তার প্রেরণায় তরুণ প্রজন্মের সামনে এগিয়ে যাওয়াই হবে তাঁকে সম্মান জানানো।
 
এটিএম শামসুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন তাঁর সঙ্গে আড্ডা দিয়েছি। তিনি চিরঞ্জীব ব্যক্তিত্ব। আমাদের অস্তিত্বে মিশে রয়েছেন। তিনি সৈয়দ শামসুল হক স্মরণে তাঁর লেখা একটি কবিতা পাঠ করে শোনান।
 
নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বলেন, সৈয়দ শামসুল হককে নিয়ে শোক নয় তাকে নিয়ে উদযাপন করা উচিত। তিনি জাতিকে ইতিহাস, ঐতিহ্য, শৌর্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। লিখেছেন ‘আমার পরিচয়’ এর মত কবিতা।
 
আবেদ খান বলেন, সৈয়দ শামসুল হক তার জীবনকালে কালের সকল ধারাকে তার লেখায় স্থান দিয়েছেন। বাংলাদেশ, বাঙালি জাতির ইতিহাস, তার উত্সকে সমকালীন সাহিত্যে তুলে এনেছেন। মানুষের চিন্তার জগতকে প্রসারিত করে এমন স্থানে পৌঁছে গেছেন যাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করতে হবে।
 
কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা বলেন, হক ভাই চির জীবিত। গত পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে তারচেয়ে সৃষ্টিশীল কোন মানুষ দেখিনি। পরিপূর্ণ মানুষ ছিলেন, সৃষ্টিশীল ছিলেন, নান্দনিকতার পক্ষে ছিলেন। এমন মানুষকে বারবার চাই। তার মঙ্গল চেতনা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে সঠিক শ্রদ্ধা জানানো হবে।
 
আতাউর রহমান বলেন, রবীন্দ্রত্তোর সাহিত্যে যে হাতে গোনা কয়েকজন রয়েছেন তিনি তাদের অন্যতম। তিনি বেঁচে রইবেন আমাদের প্রেরণা হয়ে।
 
মোরশেদুল ইসলাম বলেন, প্রথম জীবনে চলচ্চিত্রকার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি অসামান্য কিছু চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্মেষকালের তিনি প্রথম সারির একজন।
 
গোলাম কুদ্দুছ বলেন, সৈয়দ শামসুল হক সাংস্কৃতিক কর্মীদের আত্মার আত্মীয় ছিলেন।
 
আজ কুলখানি
 
আজ রবিবার সৈয়দ হকের বাসভবনে কুলখানি অনুষ্ঠিত হবে। গুলশানের বাড়ি-৮, সড়ক -৬ এ বিকাল সাড়ে পাঁচটায় কুলখানির আয়োজন কার হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে সবাইকে কুলখানিতে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
 
টিএসসিতে সপ্তাহব্যাপী সৈয়দ হক স্মরণ
 
আজ রবিবার থেকে সপ্তাহব্যাপী সৈয়দ হক স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ। টিএসসির সবুজ চত্বরে বিকাল পাঁচটায় আয়োজনের উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এছাড়া ৬ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি চত্বরে জাতীয় কবিতা পরিষদের আয়োজনে বিকাল পাঁচটায় স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। এদিকে নয় অক্টোবর বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে জাতীয় জাদুঘরে বিকাল সাড়ে পাঁচটায় সৈয়দ হক স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়েছে।
 
অক্টোবর বাংলা একাডেমিতে শোকসভা
 
বাংলা একাডেমি ও জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি যৌথভাবে সৈয়দ শামসুল হক স্মরণে শোকসভার আয়োজন করেছে। আগামী সাত অক্টোবর বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে বিকাল চারটায় এ শোকসভা শুরু হবে।