টপ সয়েলে ইট তৈরিতে পোড়ে জ্বালানি কাঠ

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৬, ১৬:১৬

সারাদেশে চলছে ইট তৈরির মৌসুম। ইটভাটাগুলোতে অবাধে পোড়ানো হচ্ছে জ্বালানি কাঠ। এতে উজাড় হচ্ছে গাছপালা। অধিকাংশ ইটভাটায় পরিবেশগত ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স ছাড়াই চলছে ইট পোড়ানো কার্যক্রম। বেশিরভাগ ইটভাটাই নিয়ম বহির্ভূতভাবে স্থাপন করা হয়েছে বা হচ্ছে। ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে আবাদি জমির উপরিভাগ বা টপ সয়েল, নদীর তীর এবং পাহাড়ের মাটি। কাঠ ও অত্যন্ত নিম্নমানের কয়লা পোড়ানো এবং স্বল্প উচ্চতার ড্রাম চিমনি ব্যবহার করায় ইটভাটাগুলোতে নির্গত হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে কালো ধোঁয়া। এতে পার্শ্ববর্তী এলাকা, শহরাঞ্চল ও গ্রামীণ জনপথে পরিবেশগত বিপর্যয়সহ জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক হুমকির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে ইটভাটা সৃষ্ট দূষণে বয়স্ক ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া কালো ধোঁয়ার কারণে মানুষের ফুসফুসের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট ও ঠাণ্ডাজনিত নানা রোগ দেখা দিতে পারে। তাই অবৈধ ইটভাটা বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)।

 
গতকাল শনিবার পবা কার্যালয় মিলনায়তনে ‘চলতি মৌসুমে ইটভাটার দূষণ নিয়ন্ত্রণে-এখনই করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। উপস্থিত ছিলেন পীস মুভমেন্ট-এর চেয়ারম্যান প্রফেসর কামাল আতাউর রহমান, পবার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শামীম খান টিটো, বিসিএসআইআর-এর সাবেক পরিচালক ড. কে এম ফরমুজুল হক, বিএইচআরডি-এর পরিচালক মো. মাহবুবুল আলম, পরিবেশ আন্দোলন মঞ্চের সভাপতি আমির হাসান মাসুদসহ আরো অনেকে।
 
বক্তারা বলেন, ঢাকার আশপাশে শত শত অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। এতে রাজধানী ও এর আশপাশের পরিবেশ মারাত্মক দূষিত হচ্ছে। বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে ঢাকার উপকণ্ঠ এবং সেই সাথে রাজধানী। বিগত বছরগুলোর মতো চলতি মৌসুমেও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স ব্যতিরেকে দেশের বিভিন্ন ইটভাটায় ইট পোড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। এছাড়াও সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ স্বল্প উচ্চতার ড্রাম চিমনিবিশিষ্ট ইটভাটা স্থাপন এবং ১২০ ফুট উচ্চতার স্থায়ী চিমনি ইটভাটার কার্যক্রম চলছে।
 
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে এবং অনেক মূল্যবান বিরল প্রজাতির উদ্ভিদও পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। ইটভাটা সৃষ্ট দূষণ এবং কৃষিজমির উর্বর মাটির অবক্ষয় থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে এ সেক্টরে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনয়ন অত্যন্ত জরুরি।
 
পবার সাধারণ সম্পাদক আবদুস সোবহান বলেন, বাংলাদেশে বিশেষ করে শহর এলাকায় শীত মৌসুমে বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ হচ্ছে ইটভাটা এবং যানবাহনের ধোঁয়া। ইট তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ফসলি জমির উর্বর ও সারযুক্ত উপরিভাগের মাটি। এতে জমির উর্বরতা শক্তি ও ফসল উত্পাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে জমির উপরিভাগের মাটি কেটে ফেলা হলে আগামী ২০ বছরেও সেই জমির প্রয়োজনীয় জৈব পদার্থের ঘাটতি পূরণ হবে না। ফসলি জমির মাটির উপরি অংশ কাটা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে জমির ফলন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকাংশে কমে যাবে। এতে হুমকির মুখে পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা।
 
তিনি বলেন, দেশে চলতি মৌসুমে প্রায় নয় হাজার ভাটায় ইট তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫০০টি ড্রাম চিমনিবিশিষ্ট ভাটা রয়েছে। যা ২০০১ সাল থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। উপকূলীয়, বৃহত্ নদী সংশ্লিষ্ট, পাহাড়ি, বরেন্দ্র এলাকার জেলাসমূহে সবচেয়ে বেশি ড্রাম চিমনিবিশিষ্ট ভাটা রয়েছে। প্রায় চার হাজার ইটভাটার পরিবেশগত ছাড়পত্র বা জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স রয়েছে, যা মোট ভাটার ৪৪ ভাগ বা ড্রাম চিমনিবিশিষ্ট ইটভাটা ছাড়া ভাটাসমূহের ৫৩ভাগ। ড্রাম চিমনিবিশিষ্ট ইটভাটায় ১ লাখ ইট পোড়াতে গড়ে প্রায় ২,০০০ মণ কাঠ লাগে।
 
দেশে গাছ লাগানো আজ একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আমরা তার কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছি না। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ইটভাটায় নির্বিচারে কাঠ পোড়ানো। আধুনিক, পরিবেশ বান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার, নির্ধারিত মাত্রার সালফারযুক্ত কয়লা ব্যবহার, জ্বালানি হিসাবে কাঠ ও কৃষি জমির উর্বর মাটি ব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং সংশ্লিষ্ট আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ-এর মাধ্যমে ইটভাটা সৃষ্ট দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
 
এলক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, বন অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, মেজিস্ট্রেসি, এনবিআর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। ইটভাটা সংশ্লিষ্ট আইন বাস্তবায়নে ভাটার মালিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
 

ইত্তেফাক/এএন