চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা উন্নীত করণের দাবি রাজশাহীতে

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০১৬, ১৫:৫৩
 
চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছরে উন্নীত করণের দাবি নিয়ে দেশব্যাপী আন্দোলনের অংশ হিসেবে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হল মানববন্ধন। আজ শনিবার সকাল ১১টায় রাজশাহী জিরো পয়েন্টে সমবেত হয় সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকরী প্রার্থীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সাধারণ জনগণ।
 
মানববন্ধন কর্মসূচীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী সরকারি কলেজ, নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ, ওমেন্স কলেজ সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা অংশগ্রহণ করে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
 
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মো. শাহজামান রতন বলেন, চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ বছরের এ সীমানা প্রাচীর অবরুদ্ধ করে রেখেছে ছাত্র সমাজকে; আমরা ত্রিশের দেয়ালের কারণে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। বাংলাদেশের মেধাবী তরুণরাও বিভিন্ন দেশ থেকে এমফিল, পিএইচডি সহ বিভিন্ন ডিগ্রি নিয়ে দেশের সরকারকে ৩০ এর সীমারেখার কারণে কিছু দিতে পারছে না, কারণ এ সকল ডিগ্রি অর্জন করতে বয়স ত্রিশ অতিক্রম করে যায়।
 
IMG0
 
তিনি আরো বলেন উন্নত বিশ্বে তাদের জনগণকে জনশক্তিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বয়সের সীমা রেখাকে প্রাধান্য দেয়নি। অনেক দেশে অবসরের সীমা থাকলেও প্রবেশের কোন সীমা নেই। যেমন-ভারতের পশ্চিম বঙ্গে ৪০ অন্যান্য প্রদেশে ৩৮-৪০, শ্রীলঙ্কাতে ৪৫, ইন্দোনেশিয়াতে ৪৫, ইতালিতে ৩৫, ফ্রান্সে ৪০, যুক্তরাষ্ট্রে ৫৯, কানাডাতে ৫৯, সুইডেনে ৪৭, কাতারে ৩৫, নরওয়েতে ৩৫, এঙ্গোলাতে ৪৫, তাইওয়ানে ৩৫ বছর পর্যন্ত রয়েছে। আর আমাদের দেশে ৩০ এর সীমা রেখা দিয়ে বন্দী করে রাখা হয়েছে চাকরি প্রার্থীদের।
 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র নজরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে একটি পদের বিপরীতে অনেক প্রতিযোগী থাকে। তা ছাড়া আমাদের দেশে যে হারে প্রতি বছর শিক্ষার্থী পাশ করে বের হচ্ছে তার তুলনায় চাকরি খুবই কম। তাই দু একটি ভাইবা পর্যন্ত গেলেও চাকরি হবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। এর মধ্যেই দেখা যায় সরকার কর্তৃক বেঁধে দেওয়া ত্রিশ অতিক্রম করে ফেলে। তখন এক ধরণের হতাশা কাজ করে। পত্র পত্রিকায় আমরা এমনও দেখেছি হতাশার কারণে গত কয়েক বছরে অনেকে আত্মহত্যা করেছে। আমাদের মত দরিদ্র পরিবারের ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করাতেই বাবা মায়ের অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। তাই চাইলেই নিজ থেকে কিছু করতেও পারি না। এখন সরকারের উচিত হবে আমাদের দেশেও চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করা।
  
তিনি আরো বলেন, পূর্বে জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক না হওয়ায় ১৪ বছরে এস.এস.সি. পাস করা সম্ভব হত। তখন ডিগ্রি অনার্স কোর্স ছিল ৩ বছর এবং ডিগ্রি (পাস) কোর্স ছিল ২ বছর ফলে ১৮ কিংবা ১৯ বছর বয়সে স্নাতক পাস করা যেত। ফলশ্রুতিতে ১৮ কিংবা ১৯ বছর বয়সে বিসিএস সহ পি.এস.সির অন্যান্য চাকুরীগুলোতেও আবেদন করা যেত।
 
বর্তমানে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সার্টিফিকেটে বয়স লিপিবদ্ধ থাকার ফলে ১৬ বছরের পূর্বে কোন ভাবেই এস.এস.সি. পরীক্ষা দেয়া যায় না। ৩ বছরের অনার্স কোর্স ৪ বছর, ২ বছরের ডিগ্রি কোর্স ৩ বছর, ৩ বছরের ডিগ্রি কোর্সে সঙ্গে ২ বছরের মাস্টার্স ছাড়া আবেদন করা যায় না।
IMG1
৬ বছর বয়সে স্কুলে ভর্তির বিধান নির্দিষ্ট হওয়ার ফলে ১৬ বছর ৩ মাস বয়সে এস.এস.সি পরীক্ষা দিতে হয়। নন পি.এস.সি’র ক্ষেত্রে যে প্রজ্ঞাপন তাতে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ১৮ বছর। কিন্তু ১৮ বছর বয়সে ৪ বছর মেয়াদী অনার্স কিভাবে শেষ হয়? ২ বছর মেয়াদী ডিগ্রিও এখন নেই।
 
১৬ বছর ২ মাসে এস.এস.সি ১৮ বছর ৪ মাসে এইচ.এস.সি ও ১৮ বছর ১০ মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলে ১৯ বছর বয়সে প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু করলে ২৩ বছরের পূর্বে কখনো অনার্স শেষ করা সম্ভব না। তাহলে বি পি এস সি কোন যুক্তিতে চাকরির আবেদনের শুরুর বয়স ২১ থাকবে? এই অকার্যকর আইন এখনো প্রয়োগ করে ছাত্র সমাজকে চরম ভাবে ঠকানো হচ্ছে।
 
১৬ বছর এখন নির্দিষ্ট (এস.এস.সি’র ক্ষেত্রে)। নন পি.এস.সি’র ক্ষেত্রে ১৮ বছর এই চলমান আইনটি এখন অকার্যকর। ক্যাডারের ক্ষেত্রে ২১ বছরের আইনটিও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে  বিচার করলে ২৩ বছর হচ্ছে চাকরিতে আবেদনে শুরু বয়স, যদি তাই হয়, পূর্বের ন্যায় যদি আমাদের (১৮-৩০) অর্থাৎ ১২ বছর সময় দেওয়া হয় তাহলে সহজ হিসাব ২৩ এর সাথে আমাদের সুযোগ ১২ বছর যোগ করলে ২৩+১২=৩৫ বছর। এই অকার্যকর আইনগুলো সংশোধন করলেই তো চাকরিতে প্রবেশের বয়স সীমা ৩৫ বছর এমনিতেই হয়ে যায়।
 
নাটোর এন এস সরকারি কলেজের ছাত্রী লাকি আক্তার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গত পাঁচ বছরের একটি জরিপ তুলে ধরে বলেন ,বাংলাদেশের কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন জট মুক্ত নয়। ছাত্র ও শিক্ষক অনুপাতে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী ৮৭% শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধীনে অধ্যয়নরত। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলেও সত্য যে, সেই সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়টিও সেশন জট মুক্ত নয়। তার জ্বলন্ত প্রমাণ গত ৫ বছরের পরিসংখ্যান।
 
২০০৮ সালের মাস্টার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষায় সেশন জট ছিল-২ বছর ১১ মাস ১৮ দিন। ২০০৯ সালের মাস্টার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষায় সেশন জট ছিল-৩ বছর ১ মাস ০৬ দিন। ২০১০ সালের মাস্টার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষায় সেশন জট ছিল-৩ বছর ১২ দিন। ২০১১ সালের মাস্টার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষায় সেশন জট ছিল-২ বছর ১১ মাস ১০ দিন। ২০১২ সালের মাস্টার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষায় সেশন জট ছিল-২ বছর ১১ মাস ২৭ দিন। উক্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে গত ৫ বছরে প্রতি শিক্ষাবর্ষে গড় সেশন জট ছিল ৩ বছর ২ দিন।
 
উল্লেখ্য যে, ২০১৩ সালের মাস্টার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালের বর্তমান মাসের ৯ তারিখ; তবে প্রশ্ন রয়ে যায়- ২০১৪, ২০১৫ এবং ২০১৬ সালের মাস্টার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষা কবে অনুষ্ঠিত হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশনের সর্বশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯৬% শিক্ষার্থী সেশন জটে আক্রান্ত এবং ৪% শিক্ষার্থী সেশন জট মুক্ত।
 
ইত্তেফাক/আরএ