সাংবাদিক শিমুলকে গুলি করে হত্যাকারী সিরাজগঞ্জের শাজাদপুরের পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরু ছিলেন চরমপন্থি দলের নেতা। সেখান থেকে সরে এসে দীর্ঘদিন ছিলেন নিষ্ক্রিয়, এরপর যোগ দেন বিএনপিতে। সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন না পেয়ে চলে আসেন আওয়ামী লীগে। এক পর্যায়ে হয়ে যান পৌর মেয়র। আর এখন সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার পর পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। গতকাল রবিবার তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। এখনো পুলিশ তাকে আটক করতে পারেনি। সিরাজগঞ্জের প্রবীণ রাজনীতিকরা জানান, দেশ স্বাধীনের পর মিরু ছিলেন জাসদ গণবাহিনীর সদস্য। এই সুবাদেই চরমপন্থিদের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে চরমপন্থি দলের কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। আশির দশকে এসে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। ১৯৯৬ সালে সিরাজগঞ্জ এলাকার সংসদ সদস্য হতে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চান। কিন্তু বিএনপি তাকে মনোনয়ন না দিয়ে ইয়াহিয়া খান মজলিসকে মনোনয়ন দেয়। এতে মনোক্ষুণ্ন্ন হয়ে নির্বাচনের পর বিএনপি ছেড়ে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। কয়েক বছর পরই হয়ে যান শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র। তাও আবার আওয়ামী লীগ থেকেই। সর্বশেষ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তবে এলাকার সবাই তাকে সন্ত্রাসী নেতা হিসেবেই চেনেন। এবার সরাসরি দেখা গেল আসল রূপ।
হালিমুল হক মিরুর সঙ্গে তার অন্যতম সহযোগী কে এম নাসিরকেও আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গতকাল বেলা ১২টায় শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের জরুরি বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের বহিষ্কার করা হয়। এরা দুজনই উপজেলা আওয়ামী লীগে সদস্য ছিলেন। সাংবাদিকদের কাছে বহিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন বলেন, পৌর মেয়র মিরুর দলবিরোধী বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং সর্বশেষ সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া সমকাল প্রতিনিধি শিমুলকে গুলি করে হত্যার ঘটনা আওয়ামী লীগের ভাবমুর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। এজন্য উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা পুলিশকে বলে দিয়েছি, মিরুসহ এই মামলার বাকি আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করে চার্জশিট দেওয়া হোক।
গতকাল সকাল ১০টায় উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাবেক এমপি ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য চয়ন ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আজাদ রহমানসহ দলের ৪৭ জন কার্যকরী সদস্য অংশ নেন। উপস্থিত সবাই সাংবাদিক হত্যাসহ মিরুর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে কড়া সমালোচনা করে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান।
সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য চয়ন ইসলাম বলেন, এক সময়ের চরমপন্থি দলের এই নেতা এবার আর কোনো ছাড় পাবে না। পরে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে দলের সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি।
প্রসঙ্গত, ঠিকাদার কাজ না করায় শাহজাদপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বিজয় মাহমুদ প্রতিবাদ করলে মেয়র হালিমুল হক মিরুর ছোট ভাই পিন্টু লোকজন নিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে বেদম মারধর করে হাত-পা ভেঙে দেয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে দলের কর্মী-সমর্থক ও তার মহল্লা কান্দাপাড়ার লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে মনিরামপুর এলাকায় অবস্থিত পৌর মেয়র হালিমুল হক মিরুর বাড়ি ঘেরাও করে। এ সময় মেয়রের সমর্থকরা তাদের ওপরে হামলা চালালে উভয় পক্ষে সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায়ে মেয়র মিরু গুলি ছুড়লে ঘটনাস্থলে কর্তব্যরত দৈনিক সমকাল পত্রিকার শাহজাদপুর প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুলের মাথায় ও মুখে গুলি লেগে গুরুতর আহত এবং তার অবস্থার আরো অবনতি হলে শুক্রবার দুপুরে ঢাকায় নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
এদিকে এ ঘটনায় পৃথক মামলায় শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র মিরুসহ ১৮ জন আসামির মধ্যে মেয়রের ছোট ভাই পিন্টু ও মিন্টুসহ ৭ জনকে পুলিশ আটক করে।
মেয়র মীরু গ্রেফতার
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে দৈনিক সমকালের সাংবাদিক আব্দুল হাকিম হত্যা মামলার প্রধান আসামি পৌর মেয়র হালিমুল হক মীরুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল রবিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর শ্যামলী এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক ইত্তেফাককে এতথ্য নিশ্চিত করেছেন। হালিমুল হক মীরু শাহজাদপুর পৌর মেয়র এবং সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।
ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, ঢাকার পুলিশের সহায়তায় সিরাজগঞ্জ পুলিশ শ?্যামলী থেকে রাতে মীরুকে গ্রেফতার করে। ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তা সিরাজগঞ্জের গোয়েন্দা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে। আসামিকে সিরাজগঞ্জ নেয়া হচ্ছে।
