রংপুর থেকে ওমর ফারুক এসেছেন বইমেলায়। তার সঙ্গে আছে আরো দুইজন। টিএসসির পাশে নির্মাণ কাজ চলছে, সেই কনস্ট্রাকশন সাইটে এলাকার পরিচিতজনরা থাকেন। সেখানেই মাথা গুঁজে রাতটা পার করেন। এরপরে সারাদিন লিটল ম্যাগাজিনের স্টল ‘পাতাপ্রকাশ’-এ চলে মাতামাতি। ফারুক বললেন, বিক্রি খুব কম, কিন্তু আড্ডা হয় খুব।
বইমেলায় বহেড়াতলার ভিন্ন চরিত্র। শুধু স্টল বিন্যাসে নয়, এখানে যারা দাঁড়িয়ে আড্ডা মারেন তাদের আচরণে, কথায়, ভাবনায় এবং স্বপ্নে — সবকিছুতেই ভিন্নতা। নিজেদের লেখা ও ভাবনা নিয়ে সবাই মশগুল। কে কি লিখছে, কেমন লিখেছে সবকিছু নিয়ে তুমুল আলোচনা জমে ওঠে বিকাল থেকে। তাদের সবার চোখে নতুন কিছু করার স্বপ্ন। এটা লিটল ম্যাগাজিন চত্বর। বাংলা সাহিত্যের নতুন বাঁক তো এই তরুণ লেখকদের হাত দিয়েই ঘটবে আগামীতে!
ব্যক্তিগত কিংবা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র চিন্তাধারাকে প্রকাশের ইচ্ছা থেকেই লিটল ম্যাগাজিনের জন্ম। প্রতিটি বই প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত থাকে লগ্নী, যুক্ত থাকে লেখকের নামের সঙ্গে বাজারে বিকোবার প্রশ্ন। এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই সৃষ্টি হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন। আবার এটাও ঠিক যে, তরুণ লেখকদের লেখা বড় কাগজের সাহিত্য পাতায় স্থান পায় না। কিন্তু লেখকমাত্রেই বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছতে চায়। লিটল ম্যাগাজিন সেই তরুণ লেখকের নিজেকে খুঁজে নেবার জায়গা। তরুণ লেখকটিকেও পাঠকরা খুঁজে নেয় এই লিটল ম্যাগাজিন থেকেই। বাংলা সাহিত্যের অনেক বড় লেখক উঠে এসেছে এই লিটল ম্যাগাজিনে সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে।
গ্রন্থমেলায় প্রতি বছরই এই লিটল ম্যাগাজিনের জন্য ছেড়ে দেয়া হয় বহেড়াতলা। এই লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে এবারেও রয়েছে বেশ কিছু প্রকাশনা। এছাড়া বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন তাদের নামেই স্টল নিয়ে অংশ নিয়েছেন বইমেলায়। বসেছে লিটলম্যাগ কর্নার। ছোট্ট কাগজে বড় স্বপ্ন আঁকিয়েদের প্রাণকেন্দ্র। সৃষ্টিশীল তারুণ্যদীপ্ত একঝাঁক তরুণের আড্ডা বসেছে এখানে। এ বছর লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে স্টলের সংখ্যা ১১০টি। এসবের নামগুলোও খুব চমকপ্রদ। একটি স্টলের নাম ‘চিবিমা’। এর মানে কী? জিজ্ঞেস করতে তরুণ লিটলম্যাগ কর্মী জানালেন, এর মানে নদী। লিটলম্যাগ চত্বরে রয়েছে করাতকল, প্রান্ত ৫০, চারবাক, পাতাদের সংসার, চালচিত্র, গল্পকার, সরলরেখা, মানুষ, স্বপ্ন ’৭১, কবি, অর্বাক, হাতেখড়ি, চিহ্ন, গল্পকথা, তুষারধারা, সাম্প্রতিক, জেব্রাক্রসিং প্রভৃতি।
মেলায় শিক্ষামন্ত্রী, সংস্কৃতিমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব
গতকাল মেলায় এসেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। শিক্ষামন্ত্রী অন্ধ শিক্ষার্থীদের জন্য মেলার একমাত্র প্রকাশনী স্পর্শ ব্রেইল প্রকাশনীসহ বিভিন্ন প্রকাশনা ঘুরে দেখেন। তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা আরো বাড়ানোর সরকারি বিভিন্ন প্রচেষ্টার কথা জানান। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অন্ধদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় পড়াশোনা, আলাদা বই, বিনামূল্যে থাকা-খাওয়াসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথা কেউ চিন্তা করতো না। আমরাই প্রথম অন্ধ শিশুদেরকে স্বাভাবিক মানুষের মতই পড়াশোনা করাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করেছি।
এসেছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীরও শনিবার মেলায় এসেছিলেন। তিনি তিনটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। এগুলো হলো ফাতেমা সালমের লেখা ‘ সুন্দরী শূন্য’, রফিক মুহাম্মদের ‘পাখির আশা, পাখির বাসা’ ও মাইদুর রহমান রুবেলের ‘ভূতের রাজ্য’। তিনি বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন। তার সাথে বিএনপির বহু নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।
নতুন বই
গতকাল গ্রন্থমেলায় নতুন বই এসেছে ২০১টি এবং ৬২টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এরমধ্যে শিকড় প্রকাশনী এনেছে রকিব হাসানের ‘কিশোর মূসা রবীন সমগ্র-২’, হাতেখড়ি প্রকাশনা এনেছে আব্দুল হাই শিকদারের ‘পলাশী ট্রাজেডির ২৩৪ বছর পর’, দি রয়েল পাবলিশার্স এনেছে নির্মলেন্দু গুণের ‘যুগল কাব্য’, কথা প্রকাশ এনেছে ইকবাল খন্দকারের ‘কালা দিঘীর রহস্য’, ‘মরা বাড়ির আত্মা’, মোশতাক আহমেদের ‘কঙ্কাল ঘর’, সুমন্ত আসলামের ‘অন্তর ১০ নম্বর’, অনিন্দ্য প্রকাশ এনেছে আহমেদ রফিকের ‘ঢাকার মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো,’ পুথিনিলয় এনেছে পূরবী বসুর গল্প ও কবিতার খসড়া’, নালন্দা এনেছে আনোয়ার হোসাইন মঞ্জুর ‘সিপাহি বিদ্রোহ এবং একটি ঐতিহাসিক অবিচার’, সময় এনেছে আবুল মাল আবদুল মুহিতের ‘আমাদের জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন’, ভাষাচিত্র এনেছে আল রাজির ‘সাংবাদিকতা’, নবযুগ এনেছে নরেশ ভুঁইয়ার ‘নিতা তোমার জন্য’, পারিজাত এনেছে মোনায়েম সরকারের ‘মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প’, গতিধারা এনেছে মোহাম্মদ শাহ আলমগীরের ‘আটটি মুক্তিযুদ্ধের নাটক’, সূচীপত্র এনেছে মনসুর আজীজের ‘সুনির্বাচিত কবিতা’, আলোকায়ন এনেছে রবি শঙ্কর মৈত্রির ‘যাও, কিছু রেখে যেও না’, পাঞ্জেরি এনেছে আমিরুল ইসলামের ‘সোনালি রূপালি গল্প’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘কুনো ব্যাঙের লম্বা পা’, রাত্রি প্রকাশনী এনেছে সেলিনা হোসেনের ‘কিশোর গল্প সমগ্র’, অনন্যা এনেছে হুমায়ূন আহমেদের ‘নির্বাচিত ভূত’, প্রথম প্রকাশ এনেছে রবিউল ইসলামের ‘ভয়’, শিশু কিশোর প্রকাশনা এনেছে আলী ইমামের ‘নিজেই বানাও বিজ্ঞানের প্রজেক্ট’,।
মেলামঞ্চের অনুষ্ঠান
অমর একুশে উদযাপন উপলক্ষে গতকাল সকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার প্রাথমিক বাছাই পর্ব। প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম, অধ্যাপক আনজুমান আরা এবং মোবারক হোসেন। শিশু-কিশোর সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতায় ৯০ জন এবং উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় ২৬ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে।
বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আবদুল গফুর হালী : জীবন ও কর্ম শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নাসির উদ্দিন হায়দার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন রাহমান নাসির উদ্দিন এবং সাইমন জাকারিয়া। সভাপতিত্ব করেন শামসুল হোসাইন।
আজকের আয়োজন
আজ মেলার ১২তম দিনে মেলা শুরু হবে বিকাল ৩টায় এবং চলবে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। বিকাল ৪ টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে দীনেশচন্দ্র সেনের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
