সাহাদাত পারভেজের শেকড়ের টান: বুক রিভিউ

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৫:১৫
 
সাহাদাত পারভেজ রচিত ‌'গজারিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য' বইটি পড়ে কাহলীল জীবরানের ‘স্যান্ড অ্যান্ড ফোম’ এর কয়েকটা লাইন মনে পড়ে গেল। লাইনগুলো হলো I am forever walking upon these shores, betwixt the sand and the foam, The high tide will erase my foot prints and the wind will blow away the foam But the sea and the shore will remain Forever. (মানুষ মরে যায়, পচে যায়, মুছে যায় তার পদচিহ্ন। চর জেগে থাকে, সৈকত বেঁচে থাকে।)
 
আজ থেকে চারশো বছর আগে প্রমত্তা মেঘনা সাগর যৌবন হারিয়ে নি:স্ব নদীতে পরিণত হয়। মেঘনায় জেগে ওঠা সেই চরে বসতি গড়ে তুলে অচিন মানুষ। প্রত্যন্ত সেই চরটাই আজকের ব্যস্ত গজারিয়া। সেই গজারিয়া আর এই গজারিয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক। শেকড় ছড়িয়ে বায়ু-জল সংগ্রহ করে গজারিয়ার সভ্যতা হয়েছে পরিপুষ্ট। সেই শেকড়ের সন্ধান করেছেন আলোকচিত্র শিল্পী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ। শেকড় খুঁজতে গিয়ে তিনি মাটি খুঁড়েছেন, ইট-পাথরের আস্তরণ মেপেছেন। গিয়েছেন গভীরে। ক্যামেরায় দৃশ্য বন্দি করা যার কাজ, তার হাতেই বন্দি হলো গজারিয়ার ইতিহাস।
 
লেখকের গবেষণা থেকে জানতে পারি, আজকের মেঘনা নদী এক কালে আসাম উপসাগর আর বঙ্গোপোসাগরের অংশ ছিল। সে অর্থে গজারিয়াকে সাগরকন্যা বলা যেতেই পারে। সপ্তম শতকে জেগে ওঠা গজারিয়ার নাম বদলেছে বহুবার। কালের বিবর্তনে গজারিয়া দেখেছে ইতিহাসের রদ-বদল। ভিনদেশীর আঁকা মানচিত্রে সে কখনও গুজারিয়া, গজ্জারিয়া, গাজারিয়া, গুজালিয়া অথবা গুজঊলিয়া। শুরুতে সোনারগাঁয়ের অন্তর্ভুক্ত এই জনবসতির ইতিহাস মানচিত্রসহ বর্ণনা করেছেন লেখক। 
 
নদী এবং নৌপথ নির্ভর গজারিয়ার সভ্যতা ক্রমে বিকশিত হয়েছে ধারাবাহিকভাবে। মোগল, সুবাদার, ইংরেজ শাসন, পাকিস্তানি শোষণ সবকিছুর সক্রিয় অংশগ্রহণকারী গজারিয়ার বাসিন্দারা। বইটিতে মোগল আমলে ভূমি বন্দোবস্তের এক বিস্তর আর বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়, যা পাঠককে শুধু গজারিয়ার ইতিহাসই নয় বরং পরোক্ষভাবে সমগ্র বাংলার ভূমি বন্দোবস্ত সম্পর্কে ধারণা দেবে। গজারিয়া এবং তার অন্তর্গত বিভিন্ন গ্রাম কিংবা মৌজার নামকরণের ইতিহাস।
 
উদহারণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, ইমামপুরের নামকরণ প্রসঙ্গে প্রচলিত প্রবাদের সন্নিবেশ, খাঁ, পাঠান আর ইমামে ভরপুর, এই তিনে ইমামপুর! বইটিতে এমন অসংখ্য গ্রামীণ প্রবাদের ছড়াছড়ি। এছাড়া রয়েছে খনার বচন, মারফতি-পালা গান, নাম-কীর্তন, কাচনাচ, ঝাপ্পুরী ও গাড়ুই উৎসবের বর্ণনা। এসব বিবেচনায় ফোকলোর সোসাইটিতেও বইটির মূল্যমান কম নয়। 
 
বইটিতে আরও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে গজারিয়ার ভৌগলিক ক্রমবিবর্তন, নদী-নালা, খাল-বিলের মানচিত্র এবং বিবর্তনের ঐতিহাসিক পটভূমি। আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটও অত্যন্ত বিশদ আলোচনার মাধ্যমে উঠে এসেছে। অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার উপকরণ এবং ধরন দুটোই পরিবর্তিত হয়। ইজারা-প্রথা, ভূমিবন্টন কিংবা জমিদারী ও তহশীলি প্রথার বর্ণনা ছাড়াও পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষ এবং তার পরবর্তী প্রভাব নিয়ে আলোচনা রয়েছে। উদ্যমী মানুষগুলোর সাহসী জীবনযাত্রার বর্ণনা দিয়েছেন শেকড় সন্ধানী লেখক সাহাদাত পারভেজ। 
 
সমসাময়িক রাজনীতিতেও গজারিয়াবাসীর ভূমিকা চোখে পড়ার মত। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভাগের পূর্বে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা এবং দাঙ্গা পরবর্তী সামাজিক প্রেক্ষাপটও আলোচিত হয়েছে। নদীপথে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে গজারিয়ার ছাত্র ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের বর্ণনা যে কোন দেশপ্রেমিক নাগরিককে আবেগ আপ্লূত করে তুলবে। 
 
এছাড়া চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, গণপরিষদ ও জাতীয় নির্বাচনে গজারিয়ার অংশগ্রহণের ইতিহাস, গ্রাম পঞ্চায়েতের বর্ণনাও অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে গজারিয়ার ভূমিকা এবং তার বর্ণনা চোখে পড়ার মত। মুক্তিযোদ্ধা, শহীদদের তালিকা, তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির দলিলাদি এবং তাদের সচিত্র উপস্থাপনা সত্যি অবাক করার মত। 
 
গজারিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, জমিদারবাড়ি, নতুন-পুরোনো স্কুল-কলেজ, মন্দির-মসজিদ কিছুই বাদ যায়নি। বইটি পড়ার সময় পাঠক গজারিয়া ভ্রমণের এক ভার্চুয়াল স্বাদ পাবেন বলে আমার বিশ্বাস। গজারিয়ায় জন্মগ্রহণকারী এবং গজারিয়ার উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন এমন সকল মনিষী এবং ব্যক্তিবর্গের পরিচয় ও তাদের ভূমিকার সচিত্র বর্ণনা রয়েছে বইটিতে।
 
নিরেট ইতিহাস না হলেও, নৃতাত্ত্বিক কিংবা আঞ্চলিক ইতিহাসের একাডেমিক রেফারেন্স হওয়ার সব রকম যোগ্যতাই রয়েছে বইটির। এই বই আরেকটি যে অসাধারণ ভূমিকা পালন করবে, তা হলো, যে কেউ বইটি পড়ার পর নিজের জন্মভূমি কিংবা অঞ্চল নিয়ে ঠিক এমনই গবেষণাধর্মী একটি বই লিখতে উদ্বুদ্ধ হবেন। নিজের শেকড়কে জানতে চাইবেন, যেভাবে গজারিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বইটিতে লেখক জানতে চেয়েছেন এবং জানানোর চেষ্টা করেছেন তার পাঠককে। নিঃসন্দেহে লেখকের ১৭ বছরের গবেষণাশ্রম সার্থক হয়েছে।
 
ইত্তেফাক/আনিসুর