আকাশের সব নীল যেন গিয়ে ঠেকেছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত জেলা ‘হাওর কন্যা’ সুনামগঞ্জ এর অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র তাহিরপুরে। জেলা শহরের নিকট সুরমা নদীর উপর নবনির্মিত ‘আব্দুজ জহুর সেতু’র উপর দাঁড়ালেই নয়নাভিরাম খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় হাতছানি দিয়ে ডাকে। সেতু থেকে নেমে সামনে বিশাল হাওর। হাতের ডানে পাকা সড়ক দিয়ে যতই এগুনো যায় মন চলে যায় কোনো সুদূরে। চোখের সামনে বিশাল পাহাড় আর পাশে সুবজে ভরা মাঠ। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পেরিয়ে দক্ষিণে প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার তাহিরপুর। যেন প্রকৃতিপ্রেমী শিল্পীর হাতে পটে আঁকা এক ছবি। আছে পাহাড়ের গায়ে ছবির মতো গ্রাম। পাশে জাদু কাটা নদী-যেন তার গায়ে জাদু করে রয়েছে। সকালে এক রূপ বিকালে আরেকটি।
ধান, মাছ, পাখি, বালি, পাথর, কয়লা, চুনাপাথর, বনজ, ফলদ ও কৃষিজাত পণ্যে ভরা এক অঞ্চল তাহিরপুর। তাহিরপুরে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদেই ভরা নয়। স্থানটি পর্যটনের অপার সম্ভাবনার স্থল। এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য নয়নাভিরাম দৃশ্যপট। জানা যায়, শুধু এই উপজেলায় যত পর্যটন স্পট রয়েছে জেলার অন্য উপজেলাতে ততগুলো নেই। কিন্তু এই সম্পদগুলোর যথাযথ তদারকিও নেই। কোথাও নদী ভাঙনের শিকার কোথাও দখলদারদের হানা। অথচ এর সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করা সম্ভব।
জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘জেলার পর্যটন শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি এবং বাস্তবায়নও হচ্ছে। এখানকার পর্যটন স্পটগুলোর উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে পর্যটনের দিক দিয়ে সুনামগঞ্জ নেতৃত্ব দেবে।’ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত দু’ বছরে জেলা শহরে সুনামগঞ্জে ঐতিহ্য জাদুঘর স্থাপন, নতুন শিল্পকলা ভবন নির্মাণ, কোর্ট আঙ্গিনায় সেবা চত্বর স্থাপন, দৃষ্টি নন্দন ৪টি ভাস্কর্য স্থাপন, জিমনেসিয়াম স্থাপন, সুরমা ভ্যালি পার্ক নির্মাণ, টেকেরঘাট ডিসিপার্ক নির্মাণ, ডিজিটাল কালেক্টরেট ম্যানেজমেন্ট, রেডিও সুনামগঞ্জ চালু, ১৫টি স্কুলে মিনিপার্ক স্থাপন, সমগ্র শহরকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনয়ন সহ প্রায় ৪৮টি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং এগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়েছে।
উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা টেকেরঘাট অন্যতম আকর্ষণ নিলাদ্রী পাহাড়। এর পাশেই ছিল চুনা পাথর খনি প্রকল্প। সেটি কয়েক বছর থেকে বন্ধ রয়েছে। সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা এই উপজেলার অন্যতম পর্যটন স্পট নিলাদ্রী পাহাড়। একেবারে খাসিয়া পাহাড়ের লাগোয়া এই পাহাড়টি সত্যিই অপূর্ব। দেখলে মনেই হয় না এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ভূমি। জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম জানান, নিলাদ্রীর ৫৬ একর ভূমিতে মনোহর একটি পর্যটন কেন্দ্র করা হবে যার নাম হবে ডিসি পার্ক। এছাড়া বারেক টিলায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে পর্যটন কর্পোরেশন হোটেল, মোটেল করবে অচিরেই।
এছাড়া আছে টাঙ্গুয়ার হাওর। যাকে বলা হয় ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ রামসার সাইট। শীতকালে পরিযায়ী পাখির অভয়াশ্রম, বর্ষায় বিশাল জলাশায়ে নানা প্রজাতি মাছের আবাসন। উত্তর দিগন্তে সবুজ পাহাড়ে সাদা সাদা মেঘের ভেলা এক নয়ন কাড়া দৃশ্য। আর তাহিরপুর থানা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার উত্তরে রয়েছে অদৈত্ব্য মহাপ্রভুর আখড়া। এখান থেকে আরও ২ কিলোমিটার উত্তরে রয়েছে অপরূপ দর্শনীয় স্থান ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম সফরসঙ্গী সাধক পুরুষ হযরত শাহ আরেফীন (রহঃ) এর স্মৃতিবিজড়িত পুণ্যভূমি লাউড়গড়ের শাহ আরেফীন আস্তানা।
জাদুকাটা নদী ঃ মেঘালয়ের বুক চিরে নেমে এসেছে জাদুকাটা নদী। নদীর পানি যেমন ঠান্ডা তেমনি স্বচ্ছ। এ নদীতে প্রতিদিন চলে হাজার হাজার বালি-পাথর আর শ্রমিকের জীবন যুদ্ধ। ৫০ সহস্রাধিক শ্রমিক জাদুকাটা নদী থেকে বালি, নুড়িপাথর আহরণ করে। এ নদীর পানি এতোটাই স্বচ্ছ যে শীতকালে নুড়ি আর বালির খেলা চোখে পড়ে।
বারেকটিলাঃ জাদুকাটা নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে রয়েছে নয়নাভিরাম প্রায় ৩শ ফুট উঁচু বারেকটিলা। পাহাড়ি আঁকাবাকা উঁচু পথ বেয়ে বারেকটিলার ওপরে উঠলে চোখে পড়ে ঘন সবুজের সমাহার, সারি সারি ফলদ, বনজ ও ঔষধি বৃক্ষ। টিলার উপর রয়েছে কড়ই গড়া ও রাজাই নামে দুটি আদিবাসী গ্রাম। আদিবাসী বসতির মাঝে মাঝে রয়েছে বাঙালি বসতি। বারেক টিলার উপর রয়েছে আদিবাসীদের একটি র্গিজা। বারেক টিলার উপর থেকে দক্ষিণ পশ্চিম দিকে তাকালে মনে বাড়ালেই যেন তাহিরপুর উপজেলাটি ছুঁয়া যাবে।
ইত্তেফাক/নূহু
