এ নিয়ে মালিবাগ ফ্লাইওভারে ৯ জন নিহত

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৭, ০০:২০

রাজধানীর মালিবাগে মধ্যরাতে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারে ক্রেন ছিড়ে গার্ডারের নিচে চাপা পড়ে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। তার নাম মো. স্বপন (৪০)। এ ঘটনায় পলাশ (৩৫) ও নুরুন্নবী (৪০) নামে আরও দুইজন আহত হয়েছে। রবিবার রাত ২টার দিকে ফ্লাইওভারে গার্ডার তোলার সময় ক্রেন ছিঁড়ে নিচে রেললাইনের উপর পড়ে গেলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সাড়ে তিন ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এই নিয়ে ফ্লাইওভারটি নির্মাণ কাজ শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নয়জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। এদের মধ্যে তিনজন বিদ্যুতস্পৃষ্ঠ হয়ে,  তিনজন নির্মাণ কাজ চলাকালে গাড়ির ধাক্কায় এবং নির্মাণ সামগ্রী মাথায় পড়ে দুইজন নিহত হন। এছাড়া প্রায় ২০ শ্রমিক আহত হয়েছেন।

রবিবার রাতে নিহত স্বপন কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। তিনি স্থানীয় সততা ফার্নিচার নামে একটি দোকানে ও রাতে ফ্লাইওভারের কাজ করতেন। মাথায় প্রচণ্ড আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিত্সকরা জানিয়েছেন। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়ায়। এঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, রাত ২টার দিকে মালিবাগ রেলগেট এলাকায় নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের একটি গার্ডার তোলার সময় ক্রেন ছিড়ে ছিটকে নিচে পড়ে। এসময় গার্ডারের নিচে পড়ে স্বপন মারা যায়। আহত পলাশ ও নুরুন্নবীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পলাশ ফ্লাইওভারের কাজ করা তমা কনস্ট্রাকশনের প্রকৌশলী।

ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের পরিদর্শক পলাশ চন্দ্র মোদক জানান, দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের ৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রায় ৭০ ফুট লম্বা গার্ডার রেললাইন বরাবর পড়ে যায়। এতে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে তিন জনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে স্বপন নামে একজন মারা যায়। ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা রেললাইনের ওপর থেকে গার্ডার কেটে সরিয়ে ফেললে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

ঢাকা রেলপথ থানার এসআই রাশেদ রানা বলেন, সোমবার ভোর সোয়া ৬টা থেকে ট্রেন চলাচল শুরু হলেও সিডিউলে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। স্থানীয় সততা ফার্নিচারের মালিক কবির হোসেন বলেন, প্রায় বিশ বছর যাবত্ তার দোকানে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন স্বপন। তার দোকানে কাজের পাশাপাশি রাতে উড়ালসড়কের নির্মাণকাজ চলার সময় লোকজন যাতে চলাচল করতে না পারে সেজন্য চার ঘণ্টার চুক্তিতে সম্প্রতি কাজ করছিলেন স্বপন।  স্ত্রী ও তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে ডিআইটি রোডের একটি বাসায় থাকতেন স্বপন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে  দুর্ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ঘটনা তদন্তে এলজিইডির অতিরিক্ত তত্ত্বাবধায়ক আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা অনাকাঙ্খিত এবং অনভিপ্রেত। ঘটনায় কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। কাউকে এক বিন্দু ছাড় দেওয়া হবে না। নিহতের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আহতদের সুচিকিত্সার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ চলার সময় আশপাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না এমন প্রশ্নের জবাবে সাঈদ খোকন বলেন, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আমাকে জানিয়েছেন, প্রকল্প এলাকায় নিরাপত্তা পর্যাপ্ত ছিল।

দীর্ঘদিন ধরে ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ চলতে থাকায় রাজধানীর মালিবাগ-মৌচাক সড়কের বেহাল অবস্থা। ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজের কারণে সড়কের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে বড় বড় খানা-খন্দ-গর্ত। চরম ভোগান্তি মেনেই এই সড়কে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয় নগরবাসীকে। আর একটু বৃষ্টিতেই এসব গর্ত হয়ে ওঠে যেন মৃত্যুফাঁদ। নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় জনদুর্ভোগের বিষয়টি পরিকল্পনায় রাখা হলে এমন অবস্থা তৈরি হবে না।

২০১৫ সালের ৫ এপ্রিল ফ্লাইওভারের মগবাজার প্রান্তে নির্মাণ কাজ চলার সময় প্রভাতী-বনশ্রী পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় মাজেদ মন্ডল ও আসাদুল মন্ডল নামে সহদোর নিহত হন। দুর্ঘটনার পর নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান তমা কনষ্ট্রাকশন কর্তৃপক্ষ জানায়, নিহত দুই শ্রমিকের ক্ষতিপূরুণ দেওয়া হবে। গত বছরের ১৬ মার্চ। মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারে মৌচাক মার্কেটের কাছে নির্মাণ যান্ত্রপাতির আঘাতে রাব্বী আহমেদ ইমন (২২) নামে এক শ্রমিক প্রাণ হারায়। ঐ ঘটনায় তমা কনষ্ট্রাকশন কর্তৃপক্ষ বলে যে ইমনের গাফিলতির কারণেই নির্মাণ কাজ চলার সময় যন্ত্রপাতির আঘাতে তার মৃত্যু হয়। এরপর ২৫ মার্চ দুর্ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তার নিশ্চিতের আদেশ দেয় উচ্চ আদালত। ১৬ জুন বিদ্যুতস্পৃষ্ঠ হয়ে সুমন নামে এক শ্রমিক মারা যান।

নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, যারা এই নির্মাণ কাজে যুক্ত বা কাজটি করছে তারা খুব একটা দায়িত্ববান বলে মনে হয় না। দক্ষতার অভাব হয়তো ছিলো, কিন্তু সেটা পুষিয়ে যেতো যদি ব্যবস্থাপনাটা সঠিক হতো। যথেষ্ট নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়নি, সাবধানতা অবলম্বন করা হয়নি। নির্মাণের সময় আরো অনেক বেশি সাবধান হওয়া উচিত। নিয়মানুযায়ী প্রতি বছর ক্রেনেরমতো ভারি যন্ত্রাংশগুলো পরীক্ষা করা উচিত। তবে এর চর্চা আছে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্স ইন্সটিটিউট এর অধ্যাপক শাহনেওয়াজ হাসনাত-ই-রাব্বী।

উল্লেখ্য, মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করা হয় ২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। দুই বছরের মধ্যে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও শেষ হয়নি। চলতি বছরের জুনের মধ্যে ফ্লাওভার নির্মাণ কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ না হলে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরুণ দিতে হবে।

ইত্তেফাক/নূহু