১৭৫৭ থেকে ১৯৭১। দীর্ঘ এই দুই শতকে বহু বীর বহুবার স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে শত্রুর মুখোমুখি হয়েছে, লড়াই করেছে, শহীদ হয়েছে। ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ জাতি বিজয় ছিনিয়ে আনে, পূরণ হয় দুই শতকের স্বাধীনতার স্বপ্ন। সেই সব সংগ্রামের সাহসী কাহিনির তথ্য চিত্র, আলোকচিত্র এবং ইতিহাসের নানান স্মারকের সমন্বয়ে গড়ে উঠে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর জাতির গৌরবদীপ্ত ইতিহাসের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে বিকশিত সমাজ গঠনে প্রেরণা সঞ্চার করে।
প্রতিষ্ঠার ২১ বছর পর মিলেছে নতুন ঠিকানা। নিজস্ব ভবনে স্থানান্তর করা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। শুধু নতুন ভবনই নয়, বাড়ছে পরিসরও। যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা। জাদুঘরের নতুন ঠিকানা রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এফ-১১/এ-বি, সিভিক সেক্টর। ১৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন। তিনিই ২০১১ সালের ৪ মে ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে নির্মাণ কাজের সূচনা করেছিলেন। জনসাধারণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারের দেওয়া তহবিলে জাদুঘরের নয়তলা ভবন নির্মাণ শেষ হয়েছে। প্রায় দুই বিঘা জায়গার ওপর নির্মিত এই ভবনের ব্যবহারযোগ্য আয়তনের পরিমাণ ১ লাখ ৮৫ হাজার বর্গফুট।
গ্যালারিগুলোতে সংগৃহীত নিদর্শন সাজানো হচ্ছে। চারটি গ্যালারি প্রস্তুত করা হয়েছে। যার প্রথম গ্যালারিতে থাকছে বাংলার প্রাচীন সভ্যতা থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সকল সংগ্রহ। ওই সময়ের মধ্যে এই জনপদের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রত্ন নিদর্শন। দ্বিতীয় গ্যালারিতে থাকছে ১ জানুয়ারি ১৯৭১ সাল থেকে ৩০ এপ্রিল ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সকল সংগ্রহ। থাকবে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের ঘটনা থেকে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় প্রবাসী সরকার গঠন পর্ব। শব্দ ও আলোর প্রক্ষেপণের একটি বিশেষ প্রদর্শনী থাকবে এই গ্যালারিতে। ২৫ মার্চ বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার বর্বরতার চিত্র ফুটে উঠবে এই গ্যালারিতে। এছাড়া সারা দেশের গণহত্যার নিদর্শনও থাকবে। তৃতীয় গ্যালারিতে থাকছে যুদ্ধচলাকালীন সময় অর্থাত্ ১ মে থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সকল স্মৃতি। চতুর্থ গ্যালারিতে থাকছে বিজয় স্মৃতি। বাঙালির প্রতিরোধ গড়ে তোলার নিদর্শন, মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখযুদ্ধ, যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, গণমানুষের দুরবস্থা, যৌথ বাহিনীর অভিযান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিজয়, বুদ্ধিজীবী হত্যা, ঢাকায় পাকিস্তানি দখলদারদের আত্মসমর্পণসহ নানা চিত্র ক্রমান্বয়ে দেখতে পাবেন দর্শনার্থীরা।
দৃষ্টিনন্দন এ স্থাপত্যশৈলীর জাদুঘর ভবনটি আগারগাঁও পঙ্গু হাসপাতালের উল্টো দিকে চক্ষু বিজ্ঞান হাসপাতালের পাশে অবস্থিত। ছাদের ওপর আর সামনের দেয়াল থেকে কামান-বন্দুকের নলের মতো নানা আকারের কংক্রিটের নল বেরিয়ে এসেছে। যা দূর থেকেই যে কারো চোখ কেড়ে নেয়। কাছে গেলে দেখা যায়, দেয়ালের উপর ক্ষতচিহ্ন। এমন ক্ষত চিহ্নগুলো দেখে স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্ষতের একটি অনুভূতি দর্শনার্থীদের মনে জেগে উঠবে এমনটিই মনে করেন স্থপতি তানজিম হাসান।
প্রত্নতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুসেন জাহান বলেন, জাদুঘরের নতুন ঠিকানা, নিজস্ব ভবন, আয়োজন, গবেষণা ও প্রকাশনা বাংলাদেশে জাদুঘরের ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। এখানে নতুন আঙ্গিকে তথ্যগুলো সহজভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানায়, বাছাই করা নিদর্শন গ্যালারিতে প্রদর্শন করা হবে, যাতে মুক্তিযুদ্ধের পুরো ঘটনা ফুটে ওঠে। বাকিগুলো সংরক্ষিত থাকবে জাদুঘরের আর্কাইভে। আর এজন্য চারটি গ্যালারি প্রস্তুত করা হয়েছে। গ্যালারিগুলো ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলায়। আরো রয়েছে দুটি আন্তর্জাতিক গ্যালারি। তবে এখনো প্রস্তুত হয়নি। তবে আগামী দুই মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে জানান তারা।
আটজন ট্রাস্টির উদ্যোগে ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ সেগুনবাগিচার একটি ভবনে এর দ্বার উন্মুক্ত করা হয়। এই জাদুঘর জাতির গৌরবদীপ্ত ইতিহাসের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে বিকশিত সমাজ গঠনে প্রেরণা সঞ্চারে সচেষ্ট রয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা, প্রকাশনা, ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী, তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানো, মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহসহ বহুমুখী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিচালিত হয় বলে জানা গেছে।
ইত্তেফাক/নূহু
