কুষ্টিয়াবাসীর বহু প্রত্যাশিত স্বপ্নের কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ শুরু হলেও নানা জটিলতায় প্রকল্পের কাজ থেমে গেছে। নির্মাণ কাজ শুরুর পর প্রকল্পটির মেয়াদ দুবার বাড়িয়েও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। অনুমোদনের অপেক্ষায় সংশোধিত ডিপিপি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় মুখ থুবড়ে পড়েছে পুরো প্রকল্পটি। ফলে মূল ক্যাম্পাসে মেডিক্যাল কলেজ স্থানান্তর বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ ও শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবগঠিত কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ প্রকল্পটির ভিত্তি স্থাপন করেন। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রকল্পে ১০তলা ফাউন্ডেশনের ৫০০ বেডবিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনের কাজের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো নয়। বালু ভরাটের পর সবেমাত্র গ্রেটবিম ঢালাই করা হয়েছে। কলাম নির্মাণের কাজ শুরুই হয়নি। এ ছাড়া ৬তলা ফাউন্ডেশনবিশিষ্ট একাডেমিক ভবনের চারতলা পর্যন্ত নির্মাণ এবং চারতলা ভবনের দুটি ছাত্র-ছাত্রী হোস্টেল ও ডরমেটরি ভবনের কাজ সম্পন্ন হলেও ওই ভবনগুলোর ভিতরের কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিদর্শন প্রতিবেদনে ও বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের পর এর ডিজাইন পরিবর্তন করে বাস্তবায়ন করার ফলে ধাপে ধাপে ব্যয় বাড়ছে। ২৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি দুই দফা সময় বৃদ্ধি করেও অর্ধেক কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পটির ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। সেইসাথে অর্থব্যয়ের তথ্যে বড় গড়মিল উঠে এসেছে। প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদনের অন্যতম শর্ত ছিল প্রকল্প-বহির্ভূত কোনো কার্যক্রম গ্রহণ না করা। অথচ অনুমোদনকে পাশ কাটিয়ে অধিকাংশ নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কার্যাদেশ প্রদানের পর স্থাপত্য নকশা ও কাঠামোগত নকশা পরিবর্তন করা হয়েছে। অর্থ ব্যয়ের তথ্যে রয়েছে গড়মিল। প্রতিটি ভবনের সাথে আন্ডারগ্রাউন্ড ও ওয়াটার রিজার্ভার নির্মাণের সংস্থান থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। প্রকল্প পরিচালক ডা. আশরাফুল হক দারা ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, প্রকল্পটির ৫৫ ভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। দুই দফা সময় বৃদ্ধি করা হলেও ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়নি। সংশোধিত প্রস্তাবনা অনুযায়ী প্রকল্পটি সমাপ্ত করতে প্রায় ৪০ ভাগ ব্যয় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সূত্রগুলো জানায়, অনিয়ম খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কমিটি গঠন করা হবে।
আইএমইডির পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ও কারিগরি সাব-কমিটির কার্যবিবরণীসহ সুপারিশ, সুপারিশ অনুমোদন, চুক্তিপত্র, কার্যাদেশপত্র ইত্যাদির কোথাও অনুমোদিত কাজের পরিমাণ এবং চুক্তিভুক্ত উপ-খাতসমূহের মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি, যা অত্যন্ত সু-কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অধিকাংশ ক্রয় প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের সময় অনিয়ম, ভবনের ভিত প্রস্তাব মতো না রেখে হ্রাস করা, বেশি দরে চুক্তি, ভেরিয়েশন, চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন, চুক্তিভুক্ত কাজের অসম্পন্ন কাজ সম্পাদনের জন্য অসংখ্য চুক্তি ও অর্থ ব্যয়, অননুমোদিতভাবে চুক্তিমূল্য এবং ডিপিপি মূল্যের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়সহ নানাবিধ অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং অর্পিত দায়িত্ব পালনকারী কার্যালয় হতে প্রাপ্ত অগ্রগতির প্রতিবেদনে অর্থব্যয়ের ব্যাপক ভিন্নতা থাকায় প্রকৃত ব্যয় নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি বলেও আইএমইডি উল্লেখ করেছে।
কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী মহাসড়ক সংলগ্ন কালিশংকর মৌজার সরকারি বরাদ্দ ২০ একর জমির উপর কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। কুষ্টিয়া মেডিক্যাল অ্যাসিসটেন্ট ট্রেনিং ইন্সটিটিউট ভবনে ২০১০/১১ শিক্ষাবর্ষে প্রথম ব্যাচে ৫২ জন ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তির মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এই মেডিক্যাল কলেজে সাড়ে ৪০০ ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়ন করছে। অস্থায়ী ক্যাম্পাস থেকে মূল ক্যাম্পাসে স্থানান্তর বিলম্ব হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহতের পাশাপাশি আবাসিক সংকটসহ শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
ইত্তেফাক/নূহু
