আবার চালু হচ্ছে সিটিং সার্ভিস!

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০১৭, ০০:২৪

রাজধানীতে সড়ক পথে যাতায়াতে ‘নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলতা’ ঠেকাতে  বন্ধ হয়েছে গণপরিবহনে সিটিং ও গেটলক সার্ভিস। তবে এ সিদ্ধান্তে যাত্রীসেবা না বেড়ে, উল্টো দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। গত তিন দিনেও এ সমস্যার কোন সমাধান হয়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে শর্তসাপেক্ষে ফের সিটিং সার্ভিস চালুর অনুমতি দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গণপরিবহনে সিটিং সার্ভিস বন্ধে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা পর্যালোচনা করতে বলেছেন। গতকাল সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, জনগণের দুর্ভোগ হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে, অনেকের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় নিয়ে সমাধান করা উচিত। তিনি জানিয়েছেন, সিটিং সার্ভিস বন্ধের সিদ্ধান্তের কারণে নৈরাজ্য সৃষ্টি হওয়ায় সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনা জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান ও মালিক সমিতির নেতাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিআরটিএ সূত্র জানায়, মন্ত্রীর নির্দেশে আজ বুধবার বিকাল চারটায় বিআরটিএ’র এলেনবাড়ি কার্যালয়ে এক পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, বিআরটিএর অনুমতি নিয়ে সিটিং সার্ভিস বাস পরিচালনার অনুমতি দেবেন তারা। মোটরযান আইন ও রুট পারমিটে সিটিং সার্ভিসের কোন অনুমতি না থাকায় সিটিং সার্ভিস বন্ধের প্রসঙ্গটি সামনে আসে।          সড়কে বাস ছিল কম, দুর্ভোগ:সিটিং সার্ভিস বন্ধে বিআরটিএ এবং মালিক সমিতির যৌথ অভিযানের কারণে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীতে বাস ও মিনিবাস ছিল খুবই কম। এদিকে গণপরিবহনে সিটিং ও গেটলক সার্ভিস বন্ধ হলেও পরিবহন শ্রমিকরা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। পরিবহন মালিকদের বিরুদ্ধেও কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ রয়েছে। গতকাল রাজধানীর অধিকাংশ সড়কের গণপরিবহনের সংখ্যা ছিল সীমিত। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কর্মব্যস্ত মানুষ গন্তব্যে পৌঁছার জন্য উঠতে পারেননি কাঙ্ক্ষিত বাসে। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা  মতিঝিল শাপলা চত্বরে যেখানে ২৫-৩০টি বাস সবসময় দেখা যেত,  সেখানে দেখা গেছে  ৫-৬টি বাস।  অনেক মানুষ গন্তব্যে যাওয়ার জন্য রাস্তায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেছেন। যাত্রাবাড়ীর চৌরাস্তায়ও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানেও প্রচুর যাত্রী অপেক্ষায় ছিলেন বাসের জন্য। সেখান থেকে কিছু লোকাল বাস ছাড়লেও তাতে জায়গা মিলেনি অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের। এছাড়া এ সব বাস সরাসরি গাবতলী, ফার্মগেট যাওয়াতে মতিঝিলের যাত্রীরা এ সব বাসে উঠতে পারেননি।

জানা গেছে, সিটিং সার্ভিস বন্ধের অভিযানে বিআরটিএর মোবাইল কোর্ট গাড়ি ধরে ধরে জেল-জরিমানায় নেমে পড়ায় বাস বের করছেন না অনেক মালিক। আইন অনুযায়ী জরিমানা ১৫ দিনের মধ্যে পরিশোধের বিধান থাকলেও তা না মেনে ম্যাজিষ্ট্রেটরা তাত্ক্ষণিক আদায় করছেন। না দিতে পারলে গাড়ি ডাম্পিং করাসহ চালককে জেল দেয়া হচ্ছে। এতে গাড়ি চলাচল বন্ধ  রেখেছেন অনেক মালিক।

তারা অনেকেই খুব প্রভাবশালী, বললেন ওবায়দুল কাদের: বেসরকারি সড়ক পরিবহন খাতের সঙ্গে জড়িত অনেকেই খুব প্রভাবশালী বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল সচিবালয়ে বিআরটিসির বাসচাপায় নিহত ছাত্রীর পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে মন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। যারা গাড়ি চালাচ্ছেন না, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেবেন কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘কেউ নানা অজুহাতে যদি গাড়ি না চালায়, আমরা কি করতে পারি ? আমাদের দেশের বাস্তবতা কি, আমার জোর করে গাড়ি নামাতে পারব? আর গাড়ির সাথে যারা জড়িত, তারা খুব সামান্য মানুষ নয়। তারা অনেকেই খুব প্রভাবশালী ।’

পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা কি সরকারের চেয়েও  প্রভাবশালী সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, শোনেন, ‘সরকারের চেয়ে প্রভাবশালী’ এ কথাটা ঠিক নয়। সরকার যখন কঠিন সিদ্ধান্তে যায় তখন আপনারাই বলেন সরকার বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। মন্ত্রী বলেন, বিআরটিএ’র চেয়ারম্যানকে আমি সকালে ডেকে এনেছি, মালিক সমিতির দু-তিনজনের সঙ্গেও কথা বলেছি। তাদের বলেছি, বিষয়টি রিভিউ করার জন্য। সিটিং সার্ভিস বন্ধের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য বুধবার (আজ) একটি সভা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ, যাত্রী প্রতিনিধিসহ  সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসে পুরো পরিস্থিতি রিভিউ করে এ ব্যাপারে  জনস্বার্থে বাস্তবভিত্তিক ও ন্যায়ানুগ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ।

যাত্রীদের শায়েস্তা করতে বাসে সন্ত্রাসী!: যাত্রী ভোগান্তি কমাতে জরুরি ভিত্তিতে পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গতকাল দুপুরের দিকে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানায় সংগঠনটি। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, সিটিং সার্ভিস বন্ধের নামে রাজধানীতে ‘অঘোষিত’ পরিবহন ধর্মঘট চলছে। যেসব বাস এই ধর্মঘটে রয়েছে, এগুলোর রুট পারমিট বাতিল করাসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, সিটিং সার্ভিস বন্ধে যাত্রীদের শায়েস্তা করতে মিরপুর রুটের অধিকাংশ বাসে মাস্তান প্রকৃতির কিছু লোককে ভাড়া করে রাখা হয়েছে। বাড়তি ভাড়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুললে তারা যাত্রীদের নানাভাবে অপদস্ত করছেন। সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন।

দুটি বাস জব্দ, দুই চালকের জেল: বিআরটিএর পরিচালক ( এনফোর্সমেন্ট) নাজমুল আহসান মজুমদার জানিয়েছেন, গতকাল রাজধানীতে ভ্রম্যমাণ আদালতের অভিযান কালে ১৪০টি মামলা দায়ের করা হয়। বিভিন্ন অভিযোগে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যথাযথ ফিটনেস না থাকায় ২টি বাস আটক করে ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে ২ চালককে।

ইত্তেফাক/নূহু