তিন মাস ধরে ঢাকায় চিকুনগুনিয়া জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। চিকিত্সকরা বলছেন, গত প্রায় দুইমাস ধরে এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। চিকুনগুনিয়া মশা বাহিত একটি ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। ডেঙ্গু রোগের ভাইরাস যে এডিস মশা বহন করে, সেই মশাই চিকুনগুনিয়া ভাইরাসেরও বাহক। তবে এই রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি নেই। তবে রাজধানীতে সিটি করপোরেশনের ময়লা পরিস্কারে উদাসীনতা ও মশক নিধন কর্মসূচী প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই রোগের বাহক মশার বিস্তার বৃদ্ধি পেয়েছে। মশক নিধনে করপোশেনের অবহেলার কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নগরবাসী।
বাসার আশেপাশে ফেলানো মাটির পাত্র, কলসী, বালতি, ড্রাম, ডাবের খোলা ইত্যাদি যে সব স্থানে পানি জমতে পারে, সেখানে এডিস মশা প্রজনন করে। তাই এসব স্থানে যেন পানি জমতে না পারে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে এবং নিয়মিত বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করতে হবে।
রাজধানীর ধানমন্ডি, কলাবাগান, গ্রীনরোড, হাতিরপুল, লালমাটিয়া, মালিবাগ, বাসাবো, গুলশান, উত্তরা ও মিরপুরের কিছু এলাকায় চিকুনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত মানুষ বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকেও রোগী আসছে। চিকুনগুনিয়া প্রথম ধরা পড়ে ১৯৫২ সালে আফ্রিকায়। প্রথম তানজানিয়ায় রোগটি সনাক্ত হয়। তবে এখন বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে রোগটি দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এই রোগের কোন নির্দিষ্ট প্রতিকার নেই। লক্ষণ দেখে চিকিত্সা ঠিক করা হয়।
বাংলাদেশে প্রথম ২০০৮ সালে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ২০১১ সালে ঢাকার দোহার উপজেলায় এই রোগ দেখা গেলেও পরে বিচ্ছিন্ন দু-একটি রোগী ছাড়া এ রোগের বিস্তার আর বাংলাদেশে লক্ষ্য করা যায়নি।
ঘনবৃষ্টপাত কিংবা বর্ষার পর পর যখন মশার উপদ্রব বাড়ে, তখন চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ে।
চিকুনগুনিয়া রোগের প্রথমদিন থেকেই রোগীর অনেক বেশি তাপমাত্রায় জ্বর ওঠে। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে, আর প্রায়ই তা একশো চার/পাঁচ ডিগ্রি তাপমাত্রায় উঠে যায়। একই সাথে প্রচণ্ড মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা, বিশেষ করে হাড়ের জয়েন্টে ব্যথা হয়।
ব্যথা হয় সব অস্থিসন্ধিতে। গিটে গিটে ব্যথার পাশাপাশি মাথা কিংবা মাংসপেশিতে ব্যথা, শরীরে ঠাণ্ডা অনুভূতি, চামড়ায় লালচে দানা, বমি বমি ভাবও চিকনগুনিয়ার লক্ষণ। এজন্য গ্রাম-গঞ্জে অনেকে একে ল্যাংড়া জ্বরও বলে। জ্বর চলে যাওয়ার পর শরীরে লাল র?্যাশ ওঠে। জ্বর ভালো হলেও রোগটি অনেকদিন ধরে রোগীদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাড়ায়। অন্য কোন ভাইরাসে এতোটা ভোগান্তি হয় না।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, মেয়রের বাড়িতেও মশা আক্রমণ করে। তাই মশা নিয়ে মেয়রও কাহিল। তবে মশক নিধনের জন্য আমরা তত্পরতা আরও বাড়িয়েছি। এবার বাজেটে ২৫ কোটি টাকা রেখেছি মশক নিধনের জন্য।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ছড়িয়ে পড়া বন্ধে বাড়ির আশেপাশে যেনো পানি জমতে না পারে সেদিকে সবাইকে লক্ষ্য রাখতে হবে। একই সঙ্গে বাড়ির আঙিনা, ফুলের টব, ভাঙা অব্যবহূত পাত্রে, এসিতে জমে থাকা পানি অপসারণের মাধ্যমে মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে সবাই সহযোগিতা করবেন।
চিকিত্সা ও প্রতিকার
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ডেঙ্গু জ্বরের সঙ্গে চিকুনগুনিয়ার অনেক পার্থক্য রয়েছে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সাধারনত এত দীর্ঘ সময় ধরে শরীর ব্যথা বা অন্য লক্ষনগুলো থাকে না। যদিও জ্বর ভাল হয়ে গেলে কয়েকদিন দুর্বলতা বা ক্লান্তি লাগতে পারে। চিকুনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত হলে কেউ মারা যায় না, শুধু দীর্ঘদিনের জন্য অনেকেই স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, চিকুনগুনিয়া সন্দেহ হলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে তা নিশ্চিত হওয়া যায়। এক্ষেত্রে রোগীর রক্তে ভাইরাসের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া এন্টিবডি পরীক্ষা করে দেখা হয়। রোগীর আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে শুধু শুধু এই পরীক্ষা করার কোন দরকার নাই, কেননা এতে চিকিত্সার ক্ষেত্রে কোন লাভ হবে না।
তিনি আরও বলেন, অন্যান্য ভাইরাস জ্বরের মত এই রোগের নির্দিষ্ট কোনও চিকিত্সা নেই। এর চিকিত্সা মূলত রোগের উপসর্গ গুলোকে নিরাময় করা। রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে এবং প্রচুর পানি বা অন্যান্য তরল খেতে দিতে হবে। চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা না করে জ্বর হলে প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধই যথেষ্ঠ। এর সাথে সাথে পানি দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিতে হবে। তীব্র ব্যাথার জন্য অন্য ভাল ঔষধ প্রয়োজন হতে পারে, তবে এসপিরিন না দেয়াই ভাল। ক্লোরোকুইন এই রোগের উপশম করে বলে কেউ কেউ দাবি করছেন। রোগীকে আবার যেন মশা না কামড়ায় এজন্য তাকে মশারীর ভেতরে রাখাই ভালো। কারণ আক্রান্ত রোগীকে মশায় কামড় দিয়ে কোন সুস্থ লোককে সেই মশা কামড়ালে ঐ ব্যক্তিও এই রোগে আক্রান্ত হবেন। এছাড়া চিকুনগুনিয়া জ্বরের কোন প্রতিষেধক নেই, কোন ভ্যাক্সিন বা টিকাও নেই। তাই রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হল এডিস মশা প্রতিরোধ।
ইত্তেফাক/নূহু
