বাংলাদেশ ২০১০ থেকেই ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এর মধ্যে দু’বার ৬.৫ শতাংশের বেশি এবং দু’বার ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জ্বালানি তেল আমদানিকারক, কৃষি ও নিম্ন প্রযুক্তিজাত ম্যানুফেকচারিং খাত নির্ভর একটি দেশের পক্ষে এমন সাফল্য চলমান বিশ্বে বিরল
উন্নয়নশীল বিশ্বের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একটি নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা থাকে। তা হচ্ছে জাতীয় বাজেট। এসব দেশের অর্থনীতির আকার তুলনামূলকভাবে ছোট এবং জাতীয় উন্নয়নের প্রায় পুরো দায়িত্ব সরকার বহন করে। তাই বাজেটের গুরুত্বও অনেক বেশি। বাজেটের অনেকগুলো লক্ষ্য থাকে। ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এসব লক্ষ্যের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অন্যতম। রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজ স্থূল দেশজ উত্পাদন বা জিডিপিকেই বেশি গুরুত্ব দেন। কারণ, এটি হচ্ছে দেশের প্রতিটি কর্মক্ষম মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রবৃদ্ধির গড় হিসাব। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি হিসেবেও জিডিপি সর্বাধিক আলোচিত সূচক। সরকার ভালো না খারাপ করছে তা সচরাচর বিবেচিত হয় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন দিয়ে। যদিও নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ রবার্ট স্টিগলিস বলেছেন, ‘জিডিপি দিয়ে অর্থনীতির ভালো-মন্দ বিচার করা খুব ভালো কাজ নয়। জনগণ কেমন আছে তাও জিডিপি কম-বেশি দিয়ে পরিমাপ করা ঠিক নয়।’ তা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা নির্ধারিত হয় জিডিপি দিয়েই। কোনো দেশে পর পর দুই কোয়ার্টার অর্থাত্ ছয় মাস ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হলে দেশটিকে বলা হয় অর্থনৈতিক মন্দা কবলিত। যা ইউরোপ-আমেরিকায় দেখা দিয়েছিল ২০০৮ সালে।
সম্প্রতি প্রকাশিত আইএমএফ গ্লোবাল ইকোনোমিক আউটলুক এপ্রিল ২০১৭ অনুযায়ী বিনিয়োগ, ম্যানুফ্যাকচারিং ও বাণিজ্য খাতে দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত জাগরণ সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেগবান হচ্ছে। ফলে, তাদের মতে বিশ্ব জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০১৬ সালের ৩.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৭ সালে ৩.৫ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৩.৬ শতাংশে উন্নীত হবে। বিগত দেড় দশকের মতো আগামী বছরগুলোতেও উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেশি হবে। চীন, ভারত, বাংলাদেশসহ উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর গড় প্রবৃদ্ধি ২০১৬ সালের ৪.১ শতাংশ থেকে ২০১৭ সালে ৪.৫ শতাংশ এবং ২০১৮ সালে ৪.৮ শতাংশে উন্নীত হবে।
সারণী: সর্বাধিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী কয়েকটি দেশের অবস্থান।
সারণী থেকে দেখা যায়, ধারাবাহিকভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী সেরা ১০টি দেশই উদীয়মান ও উন্নয়নশীল গ্রুপের। বাংলাদেশ ২০১০ থেকেই ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এর মধ্যে দু’বার ৬.৫ শতাংশের বেশি এবং দু’বার ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জ্বালানি তেল আমদানিকারক, কৃষি ও নিম্ন প্রযুক্তিজাত ম্যানুফেকচারিং খাত নির্ভর একটি দেশের পক্ষে এমন সাফল্য চলমান বিশ্বে বিরল। এটি বর্তমান সরকারের একটি বড় সাফল্য। বিশ্ব নেতৃবৃন্দও এর প্রশংসা করছেন। যা দেশের জন্য গৌরবের। এমনি পটভূমিতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে দেশের অর্থনীতি বিষয়ক নীতি-আলোচনা এখন তুঙ্গে।
আলোচনা হচ্ছে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে। সাত বা সাড়ে সাত শতাংশ যা-ই ধরা হোক না কেন তা অর্জনের জন্য কার্যকর রূপরেখা বাজেটে থাকতে হবে। পদ্মা সেতুসহ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে সরকারি বিনিয়োগ অব্যাহত থাকায় উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে হয়ত বেশি বেগ পেতে হবে না। অবকাঠামো বিনিয়োগ বাড়িয়ে চীন নতুন শতাব্দীতে প্রায় এক দশক ধরে ডবল ডিজিট প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল। কিন্তু ২০১১ সাল থেকে চীনের প্রবৃদ্ধিতে শুধুই ভাটার টান চলছে। আমাদেরকে এ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি হার দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করার লক্ষ্যে অবকাঠামো বিনিয়োগকে উত্পাদনমুখী করতে হবে। এগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে কৃষি, সেবা ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে উত্পাদন বাড়াতে পারলেই প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে। কাজটি সহজ নয়। আবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব আয়ে ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে সেই অর্থ অধিক হারে অনুত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনও গণমুখী সরকারের জন্য শুভফল বয়ে আনবে না। আশি এবং নব্বইয়ের দশকে এই চাপিয়ে দেওয়ার নীতি প্রয়োগ করে একটা শ্রেণি মোটা-তাজা হয়েছে ঠিকই কিন্তু জনগণের কোনো উন্নয়ন হয়নি। সেই দুষ্টু শ্রেণি আজও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। আমাদের প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী খাতগুলোর সবচেয়ে প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, এগুলোতে উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ বেশ সীমিত। তাই বাজেট প্রণয়নকারীদের অবকাঠামো খাতে সরকারি বেসরকারি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর প্রসার ও উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এসব খাতে বিনিয়োগকারীদেরকে করের চাপ কিছুটা কম দিয়ে উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য আকৃষ্ট করার কৌশল বাজেটে থাকা দরকার। ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের বিরোধিতাও একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কারণ, কর কম দেওয়া বা না দেওয়ার প্রবণতা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এতে উত্তেজনা প্রকাশের সুযোগ নেই। মানুষকে কর ফাঁকি দেওয়া থেকে উঠিয়ে আনতে হলে সহনীয়ভাবেই এগুতে হবে। ভ্যাট যে শুধু ব্যবসায়ীদের আয় থেকে যাবে তা নয়। তা প্রতিটি ভোক্তার ওপরই পড়বে। এমনিতেই আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী জ্বালানি তেলের গড় মূল্য ব্যারেল প্রতি ২০১৬ সালে ৪৩ ডলার থেকে বেড়ে ২০১৭-১৮ তে ৫৫ ডলারে পৌঁছাবে। ফলে আমদানি পণ্যের দাম বাড়বে। উত্পাদন ব্যয় বাড়বে। মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬-৭ শতাংশ হতে পারে। তাই সাধারণ ভোক্তার ওপর যাতে বাড়তি চাপ না পড়ে সরকারকে সে চেষ্টা রাখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের বাজারগুলো রক্ষণশীল নীতির দিকে ঝুঁকছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশসহ উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে পারে। বাজেট প্রণয়নে এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
রবার্ট স্টিগলিসের কথায়ই ফিরে যাই। জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার বাড়লেই দেশের অর্থনীতি ও সব মানুষ ভালো আছে, তা কিন্তু নয়। উচ্চ প্রবৃদ্ধি হার অর্জনের সাথে সাথে দেশের প্রতিটি কর্মক্ষম মানুষ যদি কর্মের সুযোগ পায়, তাদের আয় যদি বাড়ে, ব্যাপক আয়-বৈষম্য যদি কমে আসে, সমাজে যদি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় তবেই প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে। দেশের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে মঙ্গল বয়ে আনবে। জাতীয় বাজেটে তারই প্রতিফলন ঘটবে- এমনটাই সবার প্রত্যাশা।
