আসছে বড় বাজেট ঘাটতিও বিশাল

আপডেট : ৩০ মে ২০১৭, ০৯:২০

‘উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের’ শিরোনামে আগামী বৃহস্পতিবার পহেলা জুন জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অগ্রসরমান অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বিশাল বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী।

এর মধ্যে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার উপর ৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে দুই লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। বিশাল এ বাজেটে ঘাটতিও এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে জনপ্রত্যাশা পূরণের চেষ্টাই থাকবে এ বাজেটে। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের জন্য বরাদ্দ বাড়ানোসহ বেশকিছু জনবান্ধব উদ্যোগের ঘোষণা দেবেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট ঘোষণার আগে সব ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে নতুন ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) আইন বাস্তবায়নের ইস্যুটি। ব্যবসায়ী ও অর্থমন্ত্রণালয়ের বিপরীতমুখী অবস্থান রয়েছে এ ইস্যুতে। বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীর দিকেই তাকিয়ে আছেন। এছাড়া ব্যাংকে আমানতে আবগারি শুল্ক প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার খবরটিও এখন আলোচনায়। ব্যাংকের সুদের হার কমে যাওয়ার পর নতুন করে আবগারি শুল্ক আরোপের খবরে উদ্বেগে ব্যাংকে আমানতকারীরা।

ব্যবসায়ীদের অনমনীয় অবস্থানের কারণে ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমানোর কথা বলে আসলেও শেষ পর্যন্ত ফের পূর্বের অবস্থানে থাকার পাকাপাকি ঘোষণা জানিয়ে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থনীতিবিদরাও মনে করছেন, ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশ না রেখে কমানো উচিত। অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে নি:সন্দেহে কিছুটা মূল্যস্ফীতি হবে। এর ফলে ক্ষতির মুখে পড়বে নিম্ন আয়ের মানুষ। ভ্যাটের হার ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভ্যাটের ভিন্ন ভিন্ন হার হলেও প্রশাসনিক বড় কোনো ক্ষতি হতো না। অনেক দেশেই ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট ব্যবস্থা রয়েছে। রাজস্বের পাশাপাশি জনগণের কথাও চিন্তা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

কিন্তু রাজস্বের ধাক্কা চিন্তা করে সে পথে হাঁটছেন না অর্থমন্ত্রী। এ কারণে ১৫ শতাংশ ভ্যাটেই অনড় থাকছেন অর্থমন্ত্রী।

তবে বর্তমানে সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্যে কিংবা ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট দেওয়া বেশকিছু পণ্য ও সেবাকে ভ্যাট অব্যাহতি দিতে যাচ্ছে সরকার। বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত খাতের সঙ্গে শেষ সময়ে এসে কৃষি, খাদ্য, শিক্ষাসহ আরো দুই শতাধিক পণ্য ও সেবা ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। বিশেষত যেসব খাতের কারণে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল, এমন বেশকিছু খাত ভ্যাট অব্যাহতির তালিকায় আসতে যাচ্ছে। এ বিষয়টি ইঙ্গিত করে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এবারের বাজেটের পর দ্রব্যমূল্য বাড়বে না। অতীতেও তার দেওয়া কোনো বাজেটের পর দ্রব্যমূল্য বাড়েনি। সম্প্রতি দ্রব্যমূল্য যা বেড়েছে, তা মূলত রমজানের কারণে।

অন্যদিকে ১৭০টি পণ্য বাদে বাকি এক হাজার ৩৪৯টি আমদানিকৃত পণ্যের উপর থেকে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত থেকেও সরে আসছে সরকার। কিন্তু তা সত্ত্বেও জনমনে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা কাটছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্বের ১৬০টি দেশে ভ্যাট কার্যকর আছে। এর মধ্যে হাতে গোণা কয়টি দেশ বাদে সব দেশেই ভিন্ন ভিন্ন হারে ভ্যাট ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় কার্যত ৮০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এটি সম্ভব নয়। ফলে একধরনের সংকট তৈরি হবে।

এছাড়া ব্যাংকে আমানতের উপর আবগারি শুল্ক দ্বিগুণ হচ্ছে। ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত জমার উপর দেড়শ’ টাকার স্থলে দুইশ’ টাকা দিতে হবে। তবে ১ লাখ টাকার উপরে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত স্থিতির উপর বিদ্যমান পাঁচশ’ টাকার স্থলে এক হাজার টাকা গুণতে হবে। ১০ লাখ টাকার উপরে ও এক কোটি টাকা পর্যন্ত স্থিতির উপর দেড় হাজার টাকার স্থলে তিন হাজার টাকা, এক কোটির উপরে ও পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত স্থিতির উপর সাড়ে সাত হাজার টাকার স্থলে ১৫ হাজার টাকা, ৫ কোটির উপরে যে কোনো পরিমাণ অর্থের ক্ষেত্রে ১৫ হাজার টাকার স্থলে ৩০ হাজার টাকা। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়েছিল।

বাজেটের আকার ও ব্যয়ের প্রাক্কলন

২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য ঘোষণা করা হবে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট। বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও ঋণ পরিশোধে বরাদ্দ রাখা হবে ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ভর্তুকি বাবদ থাকছে ৯ হাজার কোটি টাকা। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দরপতন এবং সরকার কয়েক দফায় গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে নতুন অর্থবছরে ভর্তুকির পেছনে সরকারের অর্থ খরচ কম হবে।

প্রবৃদ্ধির হার পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ৭ দশমিক ৪ শতাংশের লক্ষ্য থাকছে বাজেটে। সাময়িক হিসাবে চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছর লক্ষ্য ছাড়িয়ে ৭ দশমিক ২৪ ভাগ হয়েছে প্রবৃদ্ধি। আসছে বাজেটে বৈদেশিক ঋণ এবং অনুদানের ওপর থেকে নির্ভরতা কমাতে অভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ থাকবে। সঞ্চয় উত্সাহিত এবং পেনশনারদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আপাতত সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানো হচ্ছে না। তবে বাজেটের পরে কমানোর ঘোষণা আসবে। জিনিসপত্রের দাম সহনীয় রাখতে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা হবে।

এডিপির আকার ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা

আসছে নতুন অর্থবছরে মেগা প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান হওয়া শুরু করবে। এ জন্য জাতীয় অগ্রাধিকার বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রেখে নতুন অর্থবছরের এডিপির আকার চূড়ান্ত করা হয়েছে। অগ্রাধিকার ফাস্ট ট্র্যাকের প্রকল্প সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এবারের বাজেটে। এজন্য চলমান আট মেগা প্রকল্পে ৩৩ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এডিপির আকার অনুমোদন হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৪ কোটি টাকা যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৩৮ দশমিক ৫১ ভাগ বেশি। পদ্মা সেতু, পদ্মা সেতুর রেল সংযোগসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকছে পরিবহন খাতে। সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া খাতগুলোর মধ্যে পরিবহন খাতে ৪১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ২৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। বিদ্যুত্ খাতে ১৮ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা (১২.৩০%), শিক্ষা ও ধর্ম খাতে ১৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা (১০.৮৭%), ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ণ খাতে ১৪ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা (৯.৭৫%), বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে ১৪ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা (৯.৪২%), পল্লী উন্নয়ন ও পল্ল­ী প্রতিষ্ঠান খাতে ১৩ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা (৮.৫৮%), স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ খাতে ১০ হাজার ২০১ কোটি টাকা (৬. ৬৫%) এবং কৃষি খাতে ৬ হাজার ৬ কোটি টাকা (৩.৯২%) রয়েছে। নতুন অর্থবছরে এডিপিতে সব মিলিয়ে প্রকল্প সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৩১১টি।

ঘাটতি বাড়ছে

নতুন বাজেট ঘাটতি হবে মোট দেশজ উত্পাদনের (ডিজিপি) ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে বাজেটে ঘাটতি রয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। আগামী বছর তা ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।

সামাজিক নিরাপত্তা বলয় বাড়ানো হবে

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দও বাড়ছে। মাসিক ভাতার পরিমাণ একশ’ থেকে দুইশ’ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। সেই সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের বছরে দুটি উত্সব ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসছে বাজেটে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে।

বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রতি বছর প্রায় ৬০ লাখ দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আরো প্রায় ৭ লাখ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে উপকারভোগীর আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য রয়েছে। সূত্র জানায়, সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় উপকারভোগীদের একটি স্বচ্ছ, পূর্ণাঙ্গ এবং কার্যকর অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগও থাকছে। দুস্থদের ভবিষ্যত্ আত্মকর্মসংস্থানের জন্য তাদের সঞ্চয়ে উত্সাহিত করার উদ্যোগও থাকবে বলে সূত্র জানায়।

ইত্তেফাক/নূহু