যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ দেওয়ায় ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বাড়ছে

আপডেট : ৩০ মে ২০১৭, ১১:১৯
 
ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া কোন উদ্যোগই কাজে আসছে না। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়েই চলেছে। যাচাই-বাছাই ছাড়াই নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। আর নিয়মকানুন না মেনে ঋণ দেওয়ার তা আদায়ও করা যাচ্ছে না। ফলে ওইসব খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা  প্রভিশনও রাখতে হচ্ছে বেশি। আর সেটা করতে যেয়ে মূলধন ঘাটতিতে পড়ছে ব্যাংক।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, গত মার্চ প্রান্তিক শেষে ১০টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। যার মধ্যে আটটি সরকারি ব্যাংক ও দুটি বেসরকারি খাতের ব্যাংক রয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোকে ৪০০ কোটি টাকা অথবা ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশের মধ্যে যা বেশি সেই পরিমাণ অর্থ মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। এদিকে ঝুঁকি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক মানদন্ড ব্যাসেল থ্রি অনুযায়ী চলতি বছর থেকে ব্যাংকগুলোকে ন্যূনতম মূলধনের পাশাপাশি দশমিক ৬২ শতাংশ হারে অতিরিক্ত মূলধন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এতেও মূলধন ঘাটতি কিছুটা বেড়েছে।
 
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, গত মার্চ প্রান্তিক শেষে সরকারি খাতের আট ব্যাংকে ১৪ হাজার ৭০২ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। মার্চ শেষে ব্যাংটির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে সাত হাজার ২৫৩ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিক ডিসেম্বর শেষে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ছিল সাত হাজার ৮৩ কোটি টাকা। এরপর বেসিক ব্যাংকে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিকে এ পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। মার্চ শেষে রূপালী ব্যাংকের ৬৩৮ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে। সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে যার পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৭৭৯ কোটি টাকা। যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৭৪৩ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭০ কোটি টাকা। মার্চ শেষে অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৪৩ কোটিতে।
 
রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর বাইরে ঘাটতির তালিকায় রয়েছে বেসরকারি খাতের দুটি ব্যাংক। আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ঘাটতির রয়েছে এক হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি হয়েছে ৩৪০ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিক ডিসেম্বর শেষে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ছিল এক হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। একই সময়ে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৪৫ কোটি টাকা।
 
নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের জোগান দেওয়া অর্থ ও মুনাফার একটি অংশ মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। কোনো ব্যাংক মূলধনে ঘাটতি রেখে তার শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারে না।
 
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের সুদ অনেকখানি কমেছে। খেলাপি গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে পাচ্ছেন সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণের বাড়তি মেয়াদের সুযোগ। তবে সেসব সুবিধা পাওয়ার পরও কমেনি খেলাপি ঋণ। গত তিন মাসে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা। মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। যা বিতরণ হওয়া ঋণের ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক হলেও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরছে না। উদ্যোক্তারা নতুন করে বিনিয়োগে আসছেন না। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেকেই শিল্পকারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়ছে না, অন্যদিকে আগে বিতরণ হওয়া ঋণের টাকাও ফেরত পাচ্ছে না ব্যাংক। ফলে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যে সুদহার কমেছে তার ইতিবাচক প্রভাব ব্যাংকিং খাতে পড়তে সময়ে লাগবে বলেও মনে করছেন তারা। আর বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা কিছুটা কাজে লাগলেও সামগ্রিকভাবে তা খেলাপি ঋণ কমাতে পারছে না বলে জানান তারা।
 
প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, খেলাপি ঋণ বেশি বেড়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে। মার্চ শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে ছিল ২৩ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ৩১ হাজার ২৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩৫ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা হয়েছে। বিশেষায়িত দুই ব্যাংকে আগের মতোই খেলাপি ঋণ রয়েছে ৫ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা। তবে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে ২ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা থেকে কমে ২ হাজার ২৮২ কোটি টাকায় নেমেছে।
 
ইত্তেফাক/কেকে