প্রতিবছর দুরকম উত্তর প্রাধান্য পায়। এক. উত্তম বাজেট, উন্নয়নের রোডম্যাপ বাস্তবায়ন দ্রুততর হবে। দুই. বিশাল বাজেট, বাস্তবায়নের সামর্থ্য নেই। এবার অবশ্য নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। মাসখানেক আগে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট হবে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ বাজেট। তাঁর টানা নবম বাজেটের নাম দিয়েছেন, “উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ: সময় এখন আমাদের”। সাধ ও সাধ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকলে সবাই বাজেটকে স্বাগত জানায়, প্রশংসা করে। কিন্তু তা যদি হয় শ্যাম রাখি না কুল রাখি— তাহলে ফলাফল মিশ্র হওয়াই স্বাভাবিক। তবে বাজেট সংসদে পাস হওয়া পর্যন্ত কতটুকু পরিবর্তন হয় এর ওপর ফলাফল অনেকটা নির্ভর করছে। এবারের বাজেটের আরেকটি তাত্পর্য হচ্ছে, এটাই বর্তমান সরকারের শেষ বাজেট। ক্যালেন্ডারের হিসাবে বাজেটের মেয়াদ শেষেও সরকারের মেয়াদ ছয় মাস থাকবে এবং ২০১৮ সালের জুনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হবে। তবে নির্বাচনের আগে এর ইতিবাচক প্রভাব তেমন কিছুই দেখা যাবে না। কারণ, রেওয়াজ অনুযায়ী প্রথম ছয় মাস উন্নয়ন বাজেটের ২০ শতাংশও বাস্তবায়ন হয় না। তাই এবারের বাজেটের গুরুত্ব অনেক বেশি। সরকার নিশ্চয়ই আগামী চার সপ্তাহ বাজেটের বিভিন্ন প্রভাব বিশ্লেষণ করবে এবং সে অনুযায়ী বাজেট পাস হবে।
উন্নয়নশীল বিশ্বে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, কৃষি, শিল্প ও সেবাখাতের প্রসার, শিক্ষার মান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, বৈষম্য হ্রাস, সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ যাবতীয় ভালো কাজই জাতীয় বাজেটের ওপর নির্ভর করে। তাই বাজেট ধনী-গরিব, শিশু-কিশোর, শহুরে-গেঁয়ো, ব্যবসায়ী-শ্রমজীবী, পেশাজীবী-স্বেচ্ছাজীবী, চাকুরে-বেকার, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, উচ্চবিত্ত-নিম্নবিত্ত সব শ্রেণি-পেশার মানুষকেই ছুঁয়ে যায়, প্রভাবিত করে। সবারই নজর থাকে ব্যবহারিক জীবনে বাজেটের প্রতিফলনের ওপর। বাজারমূল্য উঠানামাসহ কিছু বিষয়ে জনগণ তাত্ক্ষণিক ফল পেতে শুরু করে। আর কিছু বিষয়ে ফল পায় বছরের শেষের দিকে। যা নির্ভর করে বাজেটে দেওয়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের ওপর। বাংলাদেশে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত শ্রেণির পরিবার আছে। দেশের অর্থনীতির আকার যত বড় হচ্ছে উচ্চবিত্তের সংখ্যা ততো বাড়ছে। কিন্তু এর থেকে অনেক বেশি বাড়ছে নিম্নবিত্ত। অর্থাত্ মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তে যাওয়ার সংখ্যার চেয়ে নিচে নামার সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু হওয়া উচিত নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর উত্তরণ। এ উন্নতি সাধনে এবারের বাজেটে বরাবরের মতোই সামাজিক খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদের হার হ্রাসের ঘোষণা, ব্যাংক আমানতের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ, শেয়ার বাজারের অবারিত নিম্নমুখী যাত্রা, ভ্যাট আরোপের মাধ্যমে বেশকিছু ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার ব্যবস্থা করা, প্রায় পাঁচ বছর পর বড় পরিমাণে চাল আমদানির প্রয়োজনীয়তা, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা— এ কোনোটাই মধ্য ও নিম্নবিত্তদের জন্য স্বস্তির খবর নয়। এদিকে প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি বিরাজ করছে। এ আয়ের পুরোটাই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর। ফলে তারা আগের বছরের তুলনায় কম ব্যয় করতে পারবে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশে আটকে আছে। ফলে শিল্প উত্পাদন তেমন বাড়বে না। বৈদেশিক বিনিয়োগও আশানুরূপ বাড়ছে না। ফলে নতুন কর্মসংস্থান তেমন হবে না। পরিবারগুলোতে বেকারের সংখ্যা বাড়বে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আরও চাপে পড়বে। ব্যাংক সুদ হার কমানোর ঘোষণা ভালো হতো যদি ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়তো। কেন বাড়ছে না সে নিয়ে কোনো গবেষণা নেই, কার্যকর কোনো পদক্ষেপও নেই।
আগামী অর্থবছরের মোট বাজেট ব্যয় চলতি বছরের ব্যয় ৩ লাখ ১৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিশাল ব্যয় মেটানোর জন্য ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯১ কোটি আসবে রাজস্ব আয় থেকে। ঘাটতি থাকবে ১ লাখ ১২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা, মোট জিডিপি’র ৫.০৪ শতাংশ। রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় চলতি বছরও বাজেট কমাতে হয়েছে। আগামী অর্থবছরেও লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে, বিশেষ করে ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে। বাস্তবায়ন করতে না পারলে বড় বাজেট দিয়ে আশা জাগানো ভালো কাজ নয়। বাজেট ঘাটতি বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ থেকে সংগ্রহ করা হবে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ প্রতিবছরই বাড়ছে। যা আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ নষ্ট করছে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় চাপ বাড়াচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে অব্যবস্থা কাটছে না। এটিকে গা-সহা করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষার পরিপন্থী। পুঁজিবাজার সংস্কার করেও শেয়ারের দর পতন ঠেকানো যাচ্ছে না। স্বচ্ছতাও ফিরে আসছে না। ক্ষুদ্র লগ্নিকারীদের বিনিয়োগের সুযোগ ক্রমেই সরু হয়ে আসছে। দক্ষতার সাথে প্রকল্পের কাজ তদারকি করা এবং সমাপ্ত প্রকল্প মূল্যায়ন করা হয় না। ফলে অপচয় বাড়ছে। জনগণ কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। উত্পাদনশীলতা বাড়ছে না। অথচ আমদানি-নির্ভর রপ্তানি খাতে সুবিধা আদায় করতে হলে এর বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হবে বাজেটে তার উল্লেখ নেই।
উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩০ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে পদ্মা সেতুসহ ছয়টি অগ্রাধিকার প্রকল্পে। অপর পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে আছে, পদ্মা রেল লিংক, রাজধানীতে মেট্রো রেল, দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম রেললাইন নির্মাণ, মাতারবাড়ি কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র। এ ছয়টি প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাত্ আগামী বছর প্রায় দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করা হবে এসব প্রকল্পে। এর মধ্যে চারটি বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প হওয়ায় বাজেটে বৈদেশিক সাহায্য ব্যবহার বাড়ানোর ধারণা সঠিক হতে পারে। অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ঠিকভাবে হলে ৭.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে। এছাড়া বিদ্যুত্, সড়ক, রেল, স্থানীয় সরকার এসব খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অর্থনীতিকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এসব বিনিয়োগ খুবই কার্যকর হবে। জিডিপি ও বিনিয়োগের অনুপাত ২৯ শতাংশ বা ৩২ শতাংশের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই বিনিয়োগের কত শতাংশ সরকারি খাতে এবং কত অংশ ব্যক্তিখাতে হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরেই সরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হলেই প্রবৃদ্ধির ছোঁয়া উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত সবাই পাবে। অনুন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকটাই চলে যাবে সরকারি কর্মচারিদের বেতন-ভাতা, সুদ ও ভর্তুকিতে। সামাজিক নিরাপত্তা ও ভর্তুকির ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। যা দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করবে।
বাজেট বাস্তবায়ন বাংলাদেশের বড় সমস্যা। আগামী বছরও তা থাকবে। এজন্য নীতি-কৌশলে পরিবর্তন প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন। অর্থনীতির আকার বাড়তে থাকলে তা ধারণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সংস্কার জরুরি হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে চীনের উদাহরণ দেওয়া যায়। সত্তর দশক পর্যন্ত চীনের অর্থনীতি ছিল সরকারি খাতনির্ভর এবং সংরক্ষণ নীতি ছিল তাদের বাণিজ্যের প্রধান হাতিয়ার। জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কিন্তু দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ধনী-গরীব বৈষম্য বাড়ছে। তখনকার চীনা নেতা দেং জিয়াওপিং বুঝলেন, এভাবে চললে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। হাতে নিলেন ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি। যার বাস্তবায়ন শুরু হয় ১৯৭৮ সাল থেকে। পরবর্তী দুই দশকে দুই ধাপে সংস্কার করে কৃষি খাতকে বিকেন্দ্রীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ উন্মুক্ত করা, ব্যক্তিখাতকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ দেয়া, রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া এবং উদার বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করা হয়। ফলে চীনকে পরবর্তী তিন দশক আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। গড়ে বছরে ৯.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে অর্থনীতি তেমন প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারছে না। প্রতিবছরই তা কমছে। কারণ, এ বিশাল অর্থনীতিকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন কোনো অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। প্রায় চীনের মতোই ভারতও অর্থনৈতিক উদারিকরণ শুরু করে ১৯৯১ সালে। ফলে পরবর্তী দুই দশক ভারতও উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। আয়-বৈষম্য ও ভোগ-বৈষম্য হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু ভারতও নতুন কোনো সংস্কার কর্মসূচি হাতে না নেওয়ায় প্রবৃদ্ধি কিছুটা মন্থর হচ্ছে।
৬-৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ছোঁয়া থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই বঞ্চিত হয়েছে। যার বড় নজির ব্যাপক বেকারত্ব এবং প্রতিবছরই তা বাড়ছে। জনমিতির হারে সর্বোচ্চ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও এ বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে না পারলে তার কোনো ফল দেশ পাবে না। জনগণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতিও তেমনভাবে হবে না। তখন জঙ্গিবাদসহ সামাজিক উপদ্রপগুলোতে জনশক্তিকে ভিড়ানো সহজ হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সংস্কারের উদ্যোগ না নিয়ে গতানুগতিক কাজ ভালোভাবে করার ওপর জোর দিয়ে সাময়িক বাহবা নিতে বেশি ব্যস্ত থাকছে। ফলে নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে চ্যালেঞ্জ আরো বাড়ছে। আবার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কর্মসূচি হাতে না নিয়ে কেবল অর্থনৈতিক সংস্কারের বুলি আওড়ালে হবে না। ব্যাপকভিত্তিক সংস্কারের জন্য মেধা বিনিয়োগ করতে হবে। মেধা ও পরিশ্রমের মূল্যায়নের মাধ্যমে উদ্ভাবনী শক্তি উজ্জীবীত করতে হবে। প্রশাসনিক বা আর্থিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। স্বাধীনভাবে মেধা প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে হবে। যা আমলাতান্ত্রিক ধারায় সম্ভব নয়। সংস্কারের শুরুতে হয়তঃ উদ্যোক্তা, ভোক্তা, পেশাজীবী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরাগভাজন হতে হবে। কিন্তু দিনশেষে গোটা দেশই দীর্ঘমেয়াদে হাসবে।
সংস্কার না করে বিশাল আকৃতির বাজেটের সুফল প্রত্যাশা অনুযায়ী হয় না। জনগণের মধ্যে আশা জাগায়ে হতাশায় ফেলা রোধে বছরের শুরু থেকেই লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে তত্পর হতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়াতে হবে। সকল পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশ আরো এগিয়ে যাক- এটাই প্রত্যাশা।
ইত্তেফাক/কেকে
