কেমন হলো বাজেট

আপডেট : ১০ জুন ২০১৭, ১১:২৯
 
সরকার পক্ষ বলছে দারুণ। বিরোধী পক্ষ বলছে গরীব মারার বাজেট। বিশেষজ্ঞরা বলছে উচ্চাভিলাষী যা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। আসলে বাজেটে কি আছে? চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বিশাল বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা এনবিআর খাত থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যা এযাবত্কালের সর্বোচ্চ। ২০১৬-১৭ সালের বাজেটের কোনো লক্ষ্যমাত্রাই অর্জিত না হওয়া সত্ত্বেও অর্থমন্ত্রী ফি-বছর বাজেটের আকার বাড়িয়েই চলেছেন। বলা হচ্ছে, উন্নয়ন বাজেটসহ সামাজিক সংস্কারমূলক কার্যক্রম ঠিকমত বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে। বিগত বছরেও একই ধরনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থান সে হারে বাড়েনি।
 
এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের বর্ধিত টার্গেট ৩৪.১৫ শতাংশ। আগের বছর থেকে ভ্যাট আদায়ের টার্গেট ৩২.৯ শতাংশ বেশি। কিন্তু উন্নয়ন বাজেট মাত্র ৩৯ শতাংশ, অনুন্নয়ন ব্যয় ৬১ শতাংশ। উন্নয়ন বাজেট কিন্তু কখনো পুরোটা বাস্তবায়ন হয় না। পদ্মা সেতুসহ মেগা প্রকল্পের ব্যয় হবে উন্নয়ন বাজেটের অর্থ দিয়ে। বাজেটে কেবল পোশাক খাতে ট্যাক্স কমানো হয়েছে ২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে। দাবি  থাকা সত্ত্বেও অন্য খাতে ট্যাক্স কমানো হয়নি।
 
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে ৩ শতাংশ থেকে ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে ৪ শতাংশে। এখানে ভ্যালু এডিশন ধরা হয়েছে ২৬ দশমিক ৬৭ ভাগ। এর ফলে এই খাত প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারিয়ে ধ্বংস হবে।
 
পাউরুটির উপর ভ্যাট হবে ১৫%। কারণ এতে কাঁচামালের উপর রেয়াত পাওয়া যাবে না। ৬০ টাকার একটা পাউরুটি কিনতে আপনাকে ৯ টাকা ভ্যাট দিতে হবে। হাতে তৈরি বিস্কুটের উপরও ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। এয়ারকন্ডিশন মেশিন আর হাইব্রিড গাড়ির উপর থেকে ভ্যাট তুলে নিয়ে পাউরুটির উপর ভ্যাট চাপানো কতটুকু যৌক্তিক হয়েছে তা বিবেচনার দাবি রাখে। প্যাকেজ ভ্যাট উঠে  যাওয়ায় রেয়াত নিতে না পারলে ব্যবসায়ীদেরকে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে।
 
ব্যাংকে আমানত এবং লেনদেনের উপর যে আবগারি শুল্ক ধার্য করা হয়েছে তা অনৈতিক। আবগারি শুল্ক এমন এক ধরনের কর যা কোনো পণ্য বা সেবা নিরুত্সাহিত করার জন্য ব্যবহার করা হয় যেমন-সিগারেট, মদ, তামাক ইত্যাদি। তাছাড়া আমাদের দেশে ভ্যাট প্রথা প্রবর্তনের সময় বলা হয়েছিল, বিদ্যমান বিক্রয় কর ও আবগারি শুল্ক উঠিয়ে দিয়ে সমন্বিত কর ব্যবস্থা হিসেবে এই ভ্যাট চালু করা হয়েছে। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসার উপর ভ্যাট বসানো হবে না বলা হয়েছিল। কিন্তু সেখান থেকে সরে গিয়ে ঐ ভ্যাট ধার্য করা হয়। আমরা কথায় কথায় পূর্বতন বিএনপি সরকারের সমালোচনা করলেও তাদের রেখে যাওয়া অনিয়মগুলো বদলাই না। বরং সেটা আরো বেশি করে ধারণ করি। কখনো কখনো নিজের মতো করে নতুন অনিয়ম সৃষ্টি করি। যেমন- ব্যাংক আমানত এবং লেনদেনের উপরে আবগারি শুল্ক চাপানো হলো। এখন এর ফলে ব্যাংকে আমানত নিরুত্সাহিত হবে। তাহলে এই লোকগুলো কোথায় টাকা খাটাবে? শেয়ার বাজারে? সেখান গেলে পুরো পুঁজিটাইতো হারিয়ে আসতে হবে। তাহলে জনসাধারণ এখন তাদের রিয়াল ইনকাম ধরে রাখতে কি করবে?
 
এবার সেবাখাত বলে আলাদা কোনো খাত রাখা হয়নি। গতবছরে প্রায় ৩৮টি সেবা পণ্যের মধ্যে অনেকগুলোর ভিত্তিমূল্য উঠিয়ে ১৫% হারে ভ্যাট ধার্য করা হয়েছিল। এবার উৎপাদন, সেবা ও ট্রেড সবগুলোকেই একাকার করে “সরবরাহ” নামে একটি খাত সৃষ্টি করা হয়েছে। যেখানে সেবাখাতের পণ্যগুলোর উপরে তো বটেই ট্রেডিং খাতের অনেক পণ্যের ১৫% হারে সরাসরিভাবে ভ্যাট ধার্য করা হয়েছে। উত্পাদন খাতের অনেক পণ্যের উপর রেয়াতি সুবিধা বিদ্যমান না থাকা আর এই পণ্যগুলোর কোনো ট্যারিফ মূল্য নির্ধারণ না করায় ১৫% হারেই ভ্যাট প্রদান করতে হবে।
 
সব থেকে খারাপ অবস্থার আশঙ্কা করা হচ্ছে বিদ্যুত্ খাতে। এখানে ভ্যাটের হার ছিল ৫%। এখন ১৫% হারে ভ্যাট দিতে হবে। গৃহস্থালিসহ বাণিজ্য ও শিল্পের বিদ্যুত্ বিলের ফলে বহুলাংশে বাড়বে। সেক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী যতোই আশ্বস্ত করুক, এর ফলে পণ্যমূল্য বাড়বে।