আর নয় ৪, ৫, ৬ এবার হবে ৭, ৮, ৯

উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে :সাক্ষাত্কারে পরিকল্পনামন্ত্রী

আপডেট : ১১ জুন ২০১৭, ০২:৩৫

এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাড়ছে জিডিপি প্রবৃদ্ধি। সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই গতি আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের বৃত্ত ভেঙ্গে পরপর দু’বছর ৭ শতাংশের বেশি অর্জিত হয়েছে। আর সরকারের লক্ষ্য ভিশন ২০২১ বাস্তবায়ন এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে বিশ্ববাসীর বিষ্ময় কম ছিল না। বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশকে এগিয়ে নিতে সরকারের পদক্ষেপগুলো কার্যকর হয়েছে। আগামীতেও তাই উচ্চ প্রবৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকবে এবং বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছাবে এমন আশা জাগানিয়া কথাই বললেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তারমতে, ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বৃত্ত ভেঙে বাংলাদেশ বেরিয়ে এসেছে। সে কারণেই এখনকার শ্লোগান হবে— আর নয় ৪, ৫, ৬, এবার হবে ৭, ৮,৯।

গত বৃহস্পতিবার নিজ কার্যালয়ে ইত্তেফাকের সাথে আলাপকালে তিনি বললেন, বাংলাশের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন হচ্ছে। এখন আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এসময়ে সরকার অবকাঠামো খাতে বড় বিনিয়োগ করছে। এর সুফল দু’-তিন বছরের মধ্যেই পাওয়া যাবে, তখন ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান হবে।

চলতি অর্থবছর সাময়িক হিসাবে মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) ৭ দশমিক ২ ভাগ প্রবৃদ্ধি হবে বলে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে। অবশ্য এ নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো প্রশ্ন তুলেছে। এ ধরনের বিতর্কের বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, প্রবৃদ্ধি একটি মাত্র বিষয় থেকে আসে না। সেবা, শিল্প ও কৃষি খাত মিলিয়ে আমাদের প্রবৃদ্ধি। এই তিনটি খাতের অনেকগুলো উপখাত রয়েছে যেখান থেকে প্রবৃদ্ধি আসছে। এখানে যে মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে সেটি হলো আমরা প্রবৃদ্ধির যে সংখ্যাটি বলছি সেটি হলো নির্ণীত সংখ্যা। অর্থাত্ হিসাব করে এটি পাওয়া গেছে। হিসাবের ভিত্তিতে যেটি পাওয়া গেছে সেটি আমরা প্রকাশ করেছি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির পূর্বাভাস বিষয়ে তিনি বলেন, তারা যে সংখ্যাটি বলছে সেটি হলো অনুমান ভিত্তিক এবং পূর্বাভাস মাত্র। এটি চূড়ান্ত হিসাব করে বের করা হয়নি। বছর শেষে প্রবৃদ্ধি নিয়ে আমরা যে সংখ্যাটি দেখিয়ে থাকি সেই সংখ্যাটিই তারা গ্রহণ করে।

সম্প্রতি শ্রম শক্তি জরিপে দেশে ২৬ লাখ বেকার উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সাথে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, দেড় বছরে ১৪ লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে সাড়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশ বেকারত্ব কমে এমন ধারণা এখন পাল্টে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির সাথে কর্মসংস্থানের তথ্যে মিলছে না। এমন বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এটা সঠিক, যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে সে হারে কর্মসংস্থান হয়নি। এখানে বুঝতে হবে আমাদের গ্যাপটা কোথায়। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, আগে আমাদের বেশিরভাগ শ্রমিক ছিল কৃষি নির্ভর। বড় কর্মসংস্থান হতো কৃষি খাতে। এখন সেটি চলে যাচ্ছে সেবা খাতে এবং উত্পাদনশীল খাতে। মূল যে সমস্যাটি হলো, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আমাদের কর্মসংস্থানের উপর এক ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়েছে। অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। ‘জবলেস গ্রোথ’ বা কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এটিও খারাপ নয়। অর্থনীতিতে কোনো একটি সময়ে এমনটি হবে। আমরা রাস্তাঘাট করছি, ব্রিজ করছি, বড় বড় অবকাঠামো করছি। ফলে এই খাতে ব্যয় হলে কর্মসংস্থান হবে না। অর্থাত্ প্রবৃদ্ধি হবে কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়বে না। এগুলো যখন ব্যবহার বাড়বে তখন কর্মসংস্থান বাড়বে। এর ফল পাওয়া যাবে দুই-তিন বছর পর।

তিনি বলেন, গত দুই বছর আমাদের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ অনেক কমে গিয়েছিল। তবে এবছর বাড়ছে। নতুন কর্মসংস্থান কম হওয়ার এটিও একটি কারণ। তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন হচ্ছে। আগে ৫ জন শ্রমিক যে কাজ করতো এখন প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে একজন শ্রমিক ৫ জনের কাজ করছে। ফলে আমাদের কিছু সময়ের জন্য ‘জবলেস গ্রোথ’ হবে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে জমি পাওয়া বড় সঙ্কট হয়ে উঠছে, এমন বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে লোটাস কামাল বলেন, প্রকল্পে জমির সংকট নতুন কিছু নয়। এটা থাকবেই। এখানে সংস্কারমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের সমস্যা হলো প্রকল্প একনেকে অনুমোদন না হলে আমরা জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে আগে থেকেই কিছু করতে পারি না। আবার একনেকে অনুমোদনের জন্য যে সময় চলে যায় তাতে জমির দাম বেড়ে যায়। এ বিষয়টি আমরা কিভাবে সংস্কার করতে পারি সে বিষয়ে কাজ করছি। ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়টি সুরাহা করে যাতে প্রকল্প অনুমোদনের সাথে সাথেই আমরা বাস্তবায়ন পর্যায়ে যেতে পারি সে ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসা হবে।

প্রতিবছর বাজেটের আকার বাড়ছে কিন্তু সেইসাথে উন্নয়ন বরাদ্দের অংশ কমে যাচ্ছে। একসময় মোট বাজেটের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ উন্নয়ন বরাদ্দ থাকলেও এখন সেটি ৪০ ভাগে নেমে এসেছে, এবছর এটি ৩৯ শতাংশ। বাজেটে উন্নয়ন বরাদ্দের অংশ নিয়ে তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বাজেট হয়। উন্নয়ন বরাদ্দ বেশি প্রয়োজন হলে, আমরা যদি বেশি ব্যয় করতে পারি তাহলে সেভাবে বরাদ্দ হবে। তার মানে এই নয় যে আমাদের বরাদ্দ কম। মূল বিষয় হলো আমাদের চাহিদা কম। চাহিদা বাড়ানো হলে অবশ্যই বাজেটে বরাদ্দ বাড়বে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাত্র এক মাসে অর্থাত্ মে মাসে এডিপির ২১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।

এবারের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকার এমন কিছু করবে না যাতে সাধারণ মানুষের সমস্যা হয়। ব্যাংকের আবগারি শুল্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংসদে আলোচনা হচ্ছে। বাজেট পাস করার আগেই এসব বিষয়ে সুষ্ঠু সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ইত্তেফাক/নূহু