এগারো পয়েন্টে যানজট যাত্রীদের ভোগান্তি

আপডেট : ২২ জুন ২০১৭, ০২:০৬

মানুষের নির্বিঘ্নে ঘরে ফেরার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে চারটি মহাসড়তের ১১টি পয়েন্ট। সড়কে নির্মাণ কাজ, বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট খানাখন্দ আগে থেকেই পরিস্থিতিকে জটিল করে রেখেছে। ঈদের গাড়ির চাপ এখনও পুরোপুরি শুরু না হলেও এরই মধ্যে প্রতিটি পয়েন্টে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। ঈদের আগমুহূর্তে এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। অপরদিকে রাজধানীতে রমজানের শুরুতে নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ থেকে আশার বাণী শোনানো হলেও যানজটে প্রতিদিনই নাকাল হতে হচ্ছে নগরবাসীদের।

এদিকে সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সবধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। গতকাল গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় মহাসড়কের সংস্কার ও চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করার জন্য আমরা যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, তাতে কোনো দুর্যোগ না থাকলে আমি আশা করি ঘরমুখো মানুষকে স্বস্তি দিতে পারব। জনদুর্ভোগটা সহনীয় মাত্রায় রাখা যাবে। সে ধরনের প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে।

বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট  ও শ্যামলী পরিবহনের এমডি  রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের চাপ বাড়েনি। তা সত্বেও সড়কে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।  কোন পয়েন্টগুলোতে ভোগান্তি পোহাতে হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক পয়েন্টই রয়েছে। তবে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে টাঙ্গাইল, গাজীপুর সিলেট , চট্টগ্রাম রুটসহ ১১ পয়েন্টে। এরমধ্যে রয়েছে গাজীপুর চৌরাস্তা, চন্দ্রা, ভুলতা, ঘোরাশাল, দাউদকান্দি ব্রিজ, মেঘনা ব্রিজ ট্রোল প্লাজা , কাঁচপুর ব্রিজ, বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল প্লাজা, আরিচা ফেরী ঘাট ও রাজধানীর সায়েদাবাদ।

যানজটে নাকাল রাজধানীবাসী ঃ রমজান শুরুর আগে মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ থেকে রাজধানীবাসীকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছিল নগরীর যানজট নিয়ন্ত্রনে থাকবে। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। প্রতিদিনই যানজটে নাকাল হচ্ছে রাজধানীবাসী।  ঈদের আনন্দ আপনজনদের সঙ্গে উপভোগ করতে অনেকেই নাড়ির টানে ছুটছেন দেশের বাড়িতে। যারা এখনো যাননি তারা ব্যস্ত কেনাকাটায়। এ কারণে গতকাল বুধবার সকাল থেকেই যানজটের কবলে পড়েছে নগরবাসী। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানজট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। দুপুরের পর গাড়িগুলো রাস্তায় স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ে নগরবাসী। বিশেষ করে নারী, শিশুদের বেশি কষ্ট হচ্ছে।

সিলেট মহাসড়কে যন্ত্রণা ভুলতা-ঘোড়াশাল ঃ ঢাকা থেকে সিলেট যেতে কাঁচপুর পেরিয়ে যাওয়ার পর গাড়িগুলোকে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকতে হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের ভুলতায়, যেখানে ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ চলছে। ভুলতা অতিক্রমের পর খানাখন্দে ভরা সড়কের কারণে যাত্রীদের যানজটের ধকল পোহাতে হচ্ছে নরসিংদীর ঘোড়াশালে। ভুলতায় ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজের পাশাপাশি সড়ক জুড়ে যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখা, উল্টোপথে গাড়ি চলার কারণে যানজট নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ভুলতায় ঢাকা বাইপাস সড়কের যানবাহনকে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে সিগন্যাল দেওয়ার কারণেও সিলেটগামী যানবাহনকে আটকে যেতে হয়।

বিকল্প সড়কের অবস্থাও খারাপ ঃ রাজধানীর উত্তরের অংশ, সাভার, গাজীপুর ও উত্তরবঙ্গের যানবাহন সিলেটসহ দেশের পূর্বাঞ্চলে যেতে টঙ্গী-ঘোড়াশাল-পাঁচদোনা সড়ক ব্যবহার করে। টঙ্গী থেকে নরসিংদীর পাঁচদোনা পর্যন্ত সড়কটি ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ। পাঁচদোনায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে মিলেছে সড়কটি। ঢাকা থেকে বের হতে অনেকে এ সড়কটি বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে। তবে অপ্রশস্ত এ সড়কের বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা। টঙ্গী পার হয়ে নিমতলী রেলক্রসিংয়ের পাশে ময়লার ভাগাড়। সেখানে সড়কে ময়লা আবর্জনা ফেলে রাখা হয়েছে। তরল বর্জ্য চুইয়ে সড়কে জমে অসংখ্য গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ফলে যানবাহন চলছে ধীরগতিতে। মীরেরবাজারে সড়কে দুপাশেই লেগুনা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে যানবাহন চলতে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। পুবাইল রেলক্রসিংয়ে রেললাইনের উপরে সড়কের বিটুমিন উঠে গিয়ে বিশাল গর্ত হয়ে গেছে। ফলে যানবাহন পার হতে অনেক সময় লাগছে।

সায়েদাবাদ ঃ গুলিস্তান, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর পূর্ব-দক্ষিণ অংশের যানজট নিরসনের জন্য নির্মিত দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ হানিফ উড়াল সড়কের এ যেন  প্রদীপের নিচে অন্ধকার। উড়াল সড়কের যাত্রাবাড়ী-কাজলা অংশে দুই পাশের রাস্তা খানাখন্দে একাকার হয়ে আছে। কোথা কোথাও ফ্লাইওভারের পাশের রাস্তাটি গ্রামের ভাঙা মেঠোপথ বলে ভুল হবে।

 দুই বছর আগে গুলিস্তান থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত ‘হানিফ ফ্লাইওভার’ নামের এই উড়াল সড়কটি চালু হয়। এত দিনেও যাত্রাবাড়ী-কাজলা রাস্তা চলাচল উপযোগী করা হয়নি। ভাঙাচোরা রাস্তায় গাড়ি চলাচল এমনই শ্লথ যে পেছনে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। আশংকা করা হচ্ছে, বর্তমান অবস্থা বজায় থাকলে এ পথে ঈদযাত্রা ভোগাবে যাত্রীদের।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ধীর গতি ঃ হাইওয়ে পুলিশের পূর্বাঞ্চল বিভাগের  পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ জানান, ঈদ উপলক্ষে গণপরিবহনের চাপ বাড়তে শুরু করেছে মহাসড়কে। এদিকে যানজট নিরসনে পদুযারবাজার রেলওভারপাসের নিচের সড়কের গর্ত ইট ও বালু দিয়ে মেরামতের কাজ করছে রেলওভারপাস নির্মাণ কাজে নিয়োজিত সেনা সদস্যরা।

দাউদকান্দির টোলপ্লাজা আর পদুয়ারবাজার এলাকায় চারলেন থেকে দুইলেনে যাওয়ার সময়ই যানজটের সৃষ্টি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দাউদকান্দিতে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান একদিকে আর যাত্রীবাহী বাস আলাদা করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে যানজট থাকবে না।

ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু জাতীয় মহাসড়ক ঃ  ঈদের গাড়ির চাপ বাড়ার আগেই দেড় ঘন্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে ১০-১৫ ঘন্টা। ভয়াবহ যানজটে স্থবির হয়ে থাকছে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু জাতীয় মহাসড়ক। দেড় ঘন্টার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে ১০-১৫ ঘন্টা। যাত্রীদের ভোগান্তি প্রতিদিনই  চরম আকার ধারণ করছে। এখানে যানজটের মুল কারণ তিনটি ফ্লাইওভারের কাজ, দুইটি রেল ওভার ব্রিজ, ভাঙ্গাচোরা ব্রিজ, রাস্তা এবং মহাসড়ক দেখা শোনার কাজে নিয়োজিত সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ দুই সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাব। এছাড়া মহাসড়কের দুই পাশে ট্রাক দিয়ে মাটি ফেলার কারণে মহাসড়ক এখন অধিক ঝুঁকিপুর্ন। এসব কারণেই মহাসড়কে তীব্র যানজট।

টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর ঃ  টঙ্গী রেলওয়ে ব্রিজের পর থেকেই মূলত দুর্ভোগ শুরু। টঙ্গী থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা ২০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে লাগছে অন্তত ৪/৫ ঘণ্টা।  ড্রেনেজ সিস্টেম না থাকায় অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সড়কে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ। গর্তে পড়ে উল্টে যাচ্ছে হালকা যানবাহন। ফলে যানজটের ভোগান্তি মাত্রা ছাড়িয়েছে। এদিকে টাঙ্গাইল সড়কের আশুলিয়া, চন্দ্রাসহ অন্তত আটটি পয়েন্টে এখন তীব্র যানজট।  দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরীঘাট ঃ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় ৪টি ফেরীঘাট দিয়ে ১৫টি ফেরীর মাধ্যমে যানবাহন পারাপার করা হলেও দৌলতদিয়া ফেরীঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে গোয়ালন্দ বাজার বাসষ্ট্যান্ড পর্যন্ত লেগে থাকে যানজট। তবে গতকাল পর্যন্ত ফেরী চলাচল স্বাভাবিক ছিল। ঈদের সময় গাড়ির চাপ বাড়লে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে বলে আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদ সম্মেলনে যাত্রী হয়রানির অভিযোগ

ঈদে যাত্রাপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে। এটিসহ নানা হয়রানির শিকার হচ্ছে ঘরমুখো মানুষ। এমনটিই জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। অবিলম্বে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে  প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল বুধবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনে ‘ঈদ যাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি বন্ধের দাবিতে’ এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, টিকিট অব্যবস্থাপনা, সড়ক অব্যবস্থাপনাসহ ঈদ যাত্রার নানাক্ষেত্রে গলদ থাকায় যাত্রীরা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

ইত্তেফাক/নূহু