পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে টানা ৯ দিনের ছুটি পেয়ে লাখ লাখ পর্যটক ছুটে গেছেন বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজার ও সিলেটে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও সিলেটের জাফলংসহ আকর্ষণীয় স্থানগুলোতে দল বেঁধে যাচ্ছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, ঈদের ছুটিতে লাখো পর্যটকে মুখর দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার। শহরের হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউসগুলো এখন পর্যটকে ঠাসা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আবহাওয়া ভালো থাকলে আগামী দু-একদিনে কয়েকগুণ বাড়তে পারে পর্যটকের সংখ্যা। আর ঈদের দিন থেকে পরের এক সপ্তাহে কক্সবাজারে ৩৫০ কোটি টাকার ব্যবসা হবে বলে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা আশা করছেন।
ঈদের দিন থেকে টানা ৯ দিনের ছুটিতে কক্সবাজার সৈকতে ভিড় করতে শুরু করেছেন পর্যটকরা। বিশেষ করে টেকনাফ পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়ক চালু হওয়ার পর সকাল-সন্ধ্যা ছুটে বেড়াচ্ছেন পর্যটকরা। মূলত ঈদের পরদিন থেকেই এখানে পর্যটকদের ঢল নামে। শহরের রাস্তাঘাটে সৃষ্টি হচ্ছে ট্রাফিক জ্যাম। শহরের বার্মিজ মার্কেটসহ বিপণীকেন্দ্রগুলো এখন দারুণ জমজমাট।
কক্সবাজারের তারকা হোটেল সি-গাল এর প্রধান নির্বাহী ইমরুল সিদ্দিকী রুমী জানান, গত ১৩ জুন পাহাড় ধসের কারণে এবার অনেক পর্যটক তিন পার্বত্য জেলায় যাচ্ছেন না। যে কারণে গত বছরের চেয়ে এবার কক্সবাজারে পর্যটকের ভিড় বেশি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, কক্সবাজারে বর্তমানে এক লাখেরও বেশি পর্যটক অবস্থান করছেন। কক্সবাজার হোটেল মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র ও ‘দ্য কক্স টুডে’ হোটেলের পরিচালক (অপারেশন) মোঃ সাখাওয়াত হোসেন জানান, ২৯ জুন পর্যন্ত পর্যটন জোন কলাতলীর প্রায় সব হোটেল বুকিং হয়ে গেছে। তাদের আশা, ঈদের পরের সাত দিন পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ পর্যটক কক্সবাজার ভ্রমণে আসবেন। গত বছর ঈদের টানা ৯ দিনের ছুটিতে কক্সবাজার ভ্রমণে আসেন অন্তত পাঁচ লাখ পর্যটক।‘ কক্সবাজার কটেজ মালিক সমিতির সভাপতি কাজী রাসেল আহমদ বলেন, সমিতির আওতাভুক্ত ১১৭টি কটেজের ৯৫ শতাংশতেই পর্যটকে ভরপুর। ২৯ জুন পর্যন্ত এ অবস্থা বজায় থাকবে। তিনি আরো জানান, কম দামে কক্ষ পাওয়া যায় বলে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজন কটেজে ওঠেন বেশি। সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার রায়হান কাজেমী জানান, ঈদে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ সর্বদা প্রস্তুত। ছয়টি অত্যাধুনিক মোটরযানে টহলে রয়েছে ছয়টি দল। সৈকতের বালুচরে টহলে আছেন ১২১ জন ট্যুরিস্ট পুলিশ। মেরিনড্রাইভ সড়কে পর্যটকদের নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশের বিশেষ টহল। পর্যটকদের নিরাপত্তায় আরো আছেন মহিলা ট্যুরিস্ট পুলিশও। পাশাপাশি কাজ করছেন লাইফ গার্ড ও বিচকর্মী। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসন পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কক্সবাজারে এসে পর্যটকরা যাতে বিড়ম্বনার শিকার না হন এবং হোটেল রেস্টুরেন্টগুলো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে না পারে সেজন্য চারজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিশেষ টিমও গঠন করা হয়েছে। তা ছাড়া শহরের হোটেল-মোটেল রেস্তোরাঁ ও যানবাহনসহ টমটম-রিকশায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধে মূল্য তালিকা টানিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সিলেট অফিস থেকে হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী জানান, ঈদের ছুটিতে শহুরে কোলাহল থেকে একটু শান্তির খোঁজে ভূস্বর্গ সিলেটে ছুটে আসছেন হাজার হাজার পর্যটক। নদী, পাহাড় ও পাথুরে সৌন্দর্যের টানে জাফলং, বিছনাকান্দিসহ সিলেটের আনাচে কানাচে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ভিড় করছেন তারা। প্রকৃতি কন্যা জাফলং-এর ধারে ডাউকি পাহাড় থেকে অবিরাম ধারায় প্রবাহমান জলপ্রপাত, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রিজ, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেল পানি, উঁচু পাহাড়ের গহিন অরণ্যের টান অগ্রাহ্য করবে, সে সাধ্য কার। ডাউকি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলধারায় পা ভেজাচ্ছেন তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সী লোকজন। নদীতে দল বেঁধে সাঁতারও কাটছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কখনো তারা নদীর পানিতে, বৃষ্টিতে ভিজছেন, আবার রোদে গা শুকাচ্ছেন। তাদের আনন্দে শরিক হচ্ছে অভিভাবকরাও। পর্যটকদের আগমনে জাফলং যেন আনন্দে উদ্বেলিত। স্থানীয়রা বলছেন, গতবারের চেয়ে এবার পর্যটক অনেক বেশি। শুধু জাফলংই নয়, ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের পদভারে মুখর হয়ে উঠেছে সিলেটের অন্যসব পর্যটন কেন্দ্রগুলোও। হাজারো পর্যটক বিছনাকান্দি, পানতুমাই, লোভাছড়া, রাতারগুল, হামহাম জলপ্রপাত, লাউয়াছড়া, সিলেট ইকোপার্কসহ বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অবগাহন করতে। জৈন্তাপুরের লালাখালের স্বচ্ছ নীল জলরাশির সৌন্দর্য, দীর্ঘ সময় সেই খালে নৌভ্রমণ করতে কার না মন চায়। সিলেটে আকর্ষণীয় স্থানগুলো দেখার সাথে সাথে হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহপরান (র.) এর মাজারও জিয়ারত করছেন তারা। সিলেটের হোটেলগুলোতে এখন পর্যটকদের প্রচণ্ড ভিড়। অনেকেই আগামী শনিবার পর্যন্ত সিলেটে অবস্থান করবেন।
ইত্তেফাক/নূহু
