প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে সিলেটের বিভিন্ন স্থানে নদ-নদীর তীর ভাঙনের কবলে পড়েছে। ফলে বসতবাড়ি, ফসলি জমিসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। এদিকে গত কয়েক বছর ধরে নদী থেকে অপরিকল্পিত বালি উত্তোলনের ফলে নদীর তীর ভাঙন ত্বরান্বিত হচ্ছে। অবৈধ চক্র প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে শক্তিশালী ড্রেজার মেশিন দিয়ে দিনের পর দিন বালি উত্তোলন করায় বিভিন্ন এলাকা বিপজ্জনকভাবে ভাঙনের শিকার হয়েছে। অনেক স্থানে সেতু ও রাস্তার কাছ থেকে বালি উত্তোলন হচ্ছে। মাঝে-মধ্যে অভিযান হলে ঐসব ড্রেজার ধরা পড়ে। তবে ক’দিন যেতে না যেতেই আবার যেই সেই অবস্থা। সিলেটের সীমান্তবর্তী কানাইঘাটের তালবাড়ী এলাকায় অবৈধভাবে সুরমা নদী থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালি উত্তোলন করায় ঐ এলাকাটি মারাত্মক ভাঙনের কবলে পড়ে। কয়েকদিন আগে স্থানীয় এলাকাবাসী জোরালোভাবে প্রশাসনের নিকট প্রতিবাদ জানালে প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে লালন মিয়া নামের একজনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও বালি উত্তোলনের সরঞ্জাম আটক করে। অন্যদিকে জৈন্তা উপজেলার রাংপানি শিকার খাল নদীর পাশের পাকা রাস্তা পাহাড়ি ঢলে নদীগর্ভে চলে গেছে। পাহাড়ি ঢলে কুশিয়ারা নদীর ডাইক ভেঙে সিলেটের বিয়ানীবাজারের মেওয়া, দুবাগসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে সিলেট-বিয়ানীবাজার সড়কের মেওয়া অংশ। প্রবল স্রোতে সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। ডুবে গেছে মসজিদ, মাদ্রাসা, ঘর-বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনাও। এতে বেশ ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয়রা। মঙ্গলবার সকালের দিকে কুশিয়ারা ডাইকের মেওয়া অংশ ভেঙে ওই এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। দুবাগ ইউনিয়নের গজুকাটা ও খাড়াভরা এলাকায়ও নদীর পানি প্রবেশ করছে। ডাইক ভেঙে কুশিয়ারা নদীর পানি প্রবল বেগে প্রবেশ করছে গ্রামীণ জনপদে বলেও জানা গেছে।
সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাদাঘাটে মরা যাদুকাটা নদী থেকে অবৈধ বালি উত্তোলনের ফলে শক্তিয়ার খলা বাজার এলাকা, এলজিইডির পাকা রাস্তা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর, জমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এদিকে মৌলভীবাজার জেলার ধলাই ও মনু নদীর অর্ধশতাধিক স্থান মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মনু নদীর ছয়টি স্থানে এবং ধলাই নদীর পাঁচটি স্থানসহ ১১ স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ফলে হাজার হাজার মানুষ ঘর-বাড়ি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নাব্যতা হ্রাস ও নদীর ধারণ ক্ষমতা না থাকায় নদীতীর ভেঙে এখন গ্রামগুলোও হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ধলাই নদী আর সদর, রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলা মনু নদীর অবস্থান। কুলাউড়া উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর, টিলাগাঁও ইউনিয়নের মিয়রাপাড়া ও রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর ও কামারচাক ইউনিয়নের ভোলানগর চাটি কোনগাঁও এবং কোনগাঁও এলাকায় মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে গেছে। ভাঙনের ফলে ঐ এলাকার ৬০টি গ্রাম বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় রমজানের আগে। নদী তীরবর্তী ক্ষতিগ্রস্তরা জানান- নদী দুইটির দুই কূলের ভাঙা অংশ নিয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করে গ্রামের পর গ্রাম, বাড়ি-ঘর আর ক্ষেত-খামার ডুবিয়ে নিয়ে যায়। একসময় মনু ও ধলাই নদী ছিল জেলার খরস্রোতা নদী। এই নদী দুইটিরই উত্পত্তিস্থল ভারত। দুই পাশে ছোট বড় অসংখ্য পাহাড়ি টিলা বেষ্টিত নদী দুইটি বয়ে গেছে জেলার কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার উপর দিয়ে। কিন্তু এখন নাব্যতা হ্রাসে নদী দুইটির ঐতিহ্য নেই বললেই চলে। তাছাড়া নদী থেকে অবৈধ ও অপরিকল্পিত বালি উত্তোলনের ফলে বিভিন্নস্থানে ভাঙন ত্বরান্বিত হচ্ছে।
ইত্তেফাক/নূহু
