দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে গত দুই দশকে। সাধারণ ব্যাংকিং পরিবর্তিত হয়েছে ডিজিটাল ব্যাংকিং-এ। আর ইন্টারনেট সেবা ও প্রযুক্তিনির্ভরতায় ব্যাংকিং সেবা প্রকৃত অর্থেই গ্রাহকের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে।
প্রযুক্তিনির্ভর গ্রাহকরা এখন নিজেদের সুবিধামতো ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারেন। টাকা উত্তোলন ও জমা, অন্য অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর, কেনাকাটার বিল পরিশোধ, বিভিন্ন সেবা মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যাংকিং দিন দিন বাড়ছে। তবে একশ্রেণির কুচক্রী মহল ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে চুরির ফাঁদ পেতে বসে আছে। কিছু তথ্য হাতে পেলেই ডিজিটাল চোরেরা খুব সহজেই টাকা হাতিয়ে নিতে পারে। ঈদ বা অন্যান্য বড় ছুটির সময়কে মোক্ষম সময় হিসাবে নেয় এ ডিজিটাল সন্ত্রাসীরা। কারণ, এসময় ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের লেনদেন কয়েকগুণ বাড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কোর ব্যাংকিং সলিউশন চালুর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা সহজ করেছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং, কার্ডভিত্তিক লেনদেন প্রভৃতি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের পদ্ধতি। এছাড়া চেক ক্লিয়ারিং ও ইলেকট্রনিক্স ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটিএন) সহজেই লেনদেন করা যায়। এসব ব্যাংকিং সব মিলিয়ে প্রায় তিন কোটি ৯০ লাখ গ্রাহক রয়েছেন। এরমধ্যে কার্ডের গ্রাহক এক কোটি ১৫ লাখ ১৩ হাজার ৬৩২ জন, ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক ১৯ লাখ ৫৮ হাজার ৬২৫ জন এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক রয়েছেন দুই কোটি ৫৫ লাখ। গ্রাহকের সেবা দেওয়ার জন্য ৯ হাজার ১৭২টি এটিএম বুথ, ৩৪ হাজার ৮৭৯টি পয়েন্ট অব সেল (পস) মেশিন, ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৭০৭ জন মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিং চালু রেখেছে ব্যাংকগুলো।
ঈদের মতো বড় ছুটির দিনগুলোতে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের লেনদেন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। গত বছরে ঈদে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেন ২৫ শতাংশের বেশি বেড়ে গিয়েছিল। এবার ঈদেরও ডিজিটাল লেনদেন বেড়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে। গত মে মাসে গড় লেনদেন ৬১৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে জুনে দাঁড়ায় ৭৭২ কোটি টাকা। ঈদের আগে এটিএম বুথ, পয়েন্ট সেল ও ই-কমার্সে মে মাসে ৫৯৭ কোটি টাকা লেনদেন হয়। ঈদ উপলক্ষে জুনে তা বেড়ে হয় ৭০৭ কোটি টাকা।
লেনদেনের সময় গ্রাহকের ভুল বা অজান্তে দুষ্কৃতিরা তথ্য চুরি করে। এর আগে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় কয়েকটি ব্যাংকের এটিএম বুথে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসিয়ে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য চুরির পর টাকা লোপাটের ঘটনা জানাজানি হলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ব্যাংকগুলোর ৩৬টি কার্ড ক্লোন করে ২০ লাখ ৬০ হাজার টাকা তুলে নিয়েছিল জালিয়াতরা। ওই চক্র অন্তত ১২০০ কার্ডের তথ্য চুরি করে। এছাড়া কার্ডের তথ্য চুরি করে বিদেশে থেকেও অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে ব্যক্তিগত তথ্য ও পাসওয়ার্ড অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত তথ্য ও পাসওয়ার্ড অন্য কেউ জেনে গেলে গ্রাহকের ব্যাংকিং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। অনেক গ্রাহক কার্ডে পাসওয়ার্ড লিখে রাখেন। অনেকে মোবাইল বা মানিব্যাগে কাগজে ইন্টারনেট ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট ও কার্ডের নম্বর এবং পাসওয়ার্ড লিখে রাখেন। এতে চোরেরা সহজেই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা সরিয়ে নিতে পারেন।
এছাড়া অনলাইনে কেনা কাটা করতে গিয়ে অনেক সময় দুর্বল গেটওয়ে ব্যবহার করা হয়। এতে টুফ্যাক্টর যে সিস্টেম সেটি কাজ করে না। গ্রাহক যে তথ্য প্রবেশ করায় ওই দুর্বল গেটওয়ে তা সংরক্ষণ করে এবং পরবর্তীতে জালিয়াতির কাজে ওইসব তথ্য ব্যবহার করে টাকা চুরি করে নেওয়া হয়।
ব্যাংকাররা বলছেন ডিজিটাল লেনদেনের ঝুঁকি চিরতরে নিরসন সম্ভব নয়। দিন যত যাচ্ছে নতুন নতুন আইটি সিস্টেম আসছে। এতে বাড়ছে হ্যাকারদের তত্পরতা। আইটি নির্ভর লেনদেনকে নিরাপদ রাখতে সবসময় আপডেট থাকতে হয়। ব্যাংকগুলো এতে প্রচুর বিনিয়োগ করছে। তবে অনেক সময় দেখা যায় গ্রাহকরা ততটা সচেতন থাকেন না। ফলে তাদের সে সুযোগ নিচ্ছে হ্যাকাররা। তাই এ বিষয়ে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হালনাগাদ করা এবং গ্রাহকদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
ডিজিটাল ব্যাংকিং নিরাপদ রাখতে বেশ কিছু নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নির্দেশনাগুলে সঠিকভাবে পালন করলে ডিজিটাল হয়রানি ও প্রতারণা থেকে নিরাপদ থাকা যাবে। ছুটির সময় যেহেতু ব্যাংকের শাখা বন্ধ থাকে সেজন্য বিকল্প সেবা এটিএম ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ে সার্বক্ষণিক লেনদেন চালু রাখতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আর জালিয়াতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সার্বক্ষণিক হেল্প লাইন চালুর রাখার কথাও রয়েছে। আর সব ধরনের বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা নিরাপদ করতে যে কোনো অংকের লেনদেনের তথ্য এসএমএস এলার্ট সার্ভিসের মাধ্যমে গ্রাহককে অবহিত করতে হবে। ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সকল ধরনের পরিশোধ সেবার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সতর্কতা অবলম্বনের জন্য গণ-মাধ্যমে বিভিন্নরকম প্রচার-প্রচারণার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটার বিল পরিশোধে পয়েন্ট অব সেল (পস) মেশিনের নেটওয়ার্ক চালু রাখা এবং জালিয়াতি প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠান ও গ্রাহককে সচেতন করতে হবে। কার্ড ছাড়া অনলাইন লেনদেনে টুফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখতে বলা হয়েছে। এসব নিয়মের ব্যতিক্রম হলেই তখন জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। তাই জালিয়াতি, হয়রানি ও প্রতারণা থেকে বাঁচতে গ্রাহকদের সচেতন হতে হবে।
