তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে এলাকায় অসন্তোষ

আপডেট : ০২ জুলাই ২০১৭, ০৩:০৯

ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জ জেলার বহুল আলোচিত হাওর রক্ষাবাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি ও অনিয়মের ব্যাপারে গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জেলার সচেতন মানুষের মধ্যে অসন্তুোষ দেখা দিয়েছে। অনেকেই এই রিপোর্ট সম্পর্কে হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, ফসলের যে ক্ষতি হয়েছে তা জাতীয় ক্ষতি। সেই ক্ষতি আর পূরণ হবে না। কিন্তু দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন যাতে আগামীতে এ ধরনের অপরাধ আর না ঘটে।

‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও’ আন্দোলনের আহ্বায়ক এডভোকেট বজলুল মজিদ খসরু ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি হতাশ। তদন্ত রিপোর্টটি অস্পষ্ট, দায়সারা। এতে সুনির্দিষ্টভাবে পিআইসি বা ঠিকাদারকে দায়ি করা হয়নি।’ ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জের বাসিন্দা কৃষক সংগ্রাম সমিতি’র কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক কৃষক নেতা খায়রুল বাশার ঠাকুর খান এই তদন্ত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বলেন, ‘যারা তদন্ত করেছেন তারা চাচ্ছেন না দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্তদের শাস্তি হোক। অতিবৃষ্টি হয়েছে সত্য, কিন্তু সময় মতো বাঁধ না হওয়ায় বিনা বাধায় পানি হাওরে ঢুকে কৃষকদের সর্বস্বান্ত করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পানি সরে গেলে আবারও সরেজমিনে বাঁধের অবস্থা দেখা হবে। এই মন্তব্যও হাস্যকর। প্রকৃতপক্ষে বাঁধ বা বাঁধের সংস্কার হলেও পানি আসার সময়ই প্রতিবছর ঐ বাঁধ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সুতরাং পানি সরার পর আবার তদন্ত করার অর্থই হচ্ছে দুর্নীতিবাজকে রক্ষা করার চেষ্টা করা।’ জেলা সিপিবি সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, তদন্ত রিপোর্টে বাঁধের কাজে অনিয়মের কথা বলা হলেও কৌশলে জড়িতদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। ঢালাওভাবে দুর্নীতির কথা বলায় দুর্নীতিবাজদের রক্ষার পথ তৈরি হয়েছে।’ একই বক্তব্য রাখেন হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সদস্য সচিব  বিন্দু তালুকদার। হাওর পারের কৃষকদের বক্তব্য, দুর্নীতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে আগামীতেও বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি হবে, ফসলহানী ঘটবে এবং দুর্নীতিবাজরা উত্সাহিত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বলেন, ‘লক্ষ লক্ষ মানুষের মুখের গ্রাস নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলেছে তাদের বিচার চাই।’

এদিকে হাওরাঞ্চলে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে শতভাগ ফসলহানির ঘটনা তদন্ত করার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি ১৯ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের কাছে হস্তান্তর করেছে। গত ২৩ জুন এই তদন্ত প্রতিবেদন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত হয়। তদন্ত কমিটি গঠনের সময় যে চারটি কার্যপরিধি নির্ধারণ করে দেওয়া হয় সেগুলো হচ্ছে -সুনামগঞ্জসহ আগাম বন্যায় প্লাবিত হাওরাঞ্চলের অন্যান্য জেলার হাওর রক্ষাবাঁধের নির্মাণ ও সংস্কার কাজে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ধীরগতি হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে তার কারণ খুঁজে বের করা, দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং আগাম বন্যা থেকে হাওর রক্ষায় সুপারিশ প্রদান। আর পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবহেলা ছিল উল্লেখ করেছে। তবে সেই সঙ্গে এও বলা হয়েছে, অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে হাওরে পানি ঢুকে ফসল নষ্ট হয়নি, অতিবৃষ্টির কারণে বাঁধ উপচে হাওরে পানি ঢুকেছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের ২৯ মার্চ পানির উচ্চতা ছিল ২ দশমিক ৪০ এমপিডব্লিউডি। চারদিনের ব্যবধানে ১ এপ্রিল পানির উচ্চতা বেড়ে ৭.০৬ এমপিডব্লিউডি-তে  উন্নীত হয়। অথচ এই প্রতিবেদনেই ২৯ মার্চের আগেও কিছু কিছু হাওর ডুবেছে এমন কথারও উল্লেখ রয়েছে। আবার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সুনামগঞ্জসহ হাওর অধ্যুষিত ছয়টি জেলায় ফসলহানির কারণ প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট।

এবার বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জে এ বছর দুই লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়। গত এপ্রিলে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওর রক্ষাবাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রায় সব কটি বাঁধ ভেঙে জেলার ১৫৪টি হাওরের এক লাখ ৬৬ হাজার ৬১২ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় তিন লাখ ২৫ হাজার ৯৯০ কৃষক পরিবার।  দেড় হাজার কোটি টাকার বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যায়।

ইত্তেফাক/নূহু