প্রবল বর্ষণের পূর্বাভাস পাহাড় ধসের আশঙ্কা

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৭, ০০:০৫

চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবল বর্ষণ হতে পারে। অতি বর্ষণে আবারও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এদিকে, আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাসকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়সমূহে বসবাসকারী লোকজনকে সরে যাওয়ার জন্য প্রতিদিন মাইকিং করা হচ্ছে।

আবহাওয়াবিদ আব্দুর রহমান গতকাল রবিবার ইত্তেফাককে বলেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার কারণে আগামী ৬/৭ জুলাই পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। তবে টানা বৃষ্টি হবে এমন নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, অতিবর্ষণে আবার পাহাড় ধসের পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কতটুকু বৃষ্টি হয় এবং পাহাড়গুলোর অবস্থার ওপর বিপর্যয়ের দিকটা নির্ভর করে। বিশেষ করে ন্যাড়া ও ফাটলযুক্ত পাহাড় এবং কাটা পাহাড়গুলো সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ, কাটা ও গাছ-পালাবিহীন পাহাড়ের মাটিতে সহজে পানি ঢুকে ধসের আশংকা বাড়িয়ে দেয়। তিনি আরো বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোর ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ের ঝুঁকির সম্পর্ক অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আক্তার গতরাতে ইত্তেফাককে বলেন, পাহাড় যেখানে থাকবে সেখানে ধসের ঝুঁকি থাকবেই। আর অতিবৃষ্টির ফলে পাহাড় ধসের ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়।  তিনি বলেন, আমাদের এখানে বৃষ্টিপাত বেশি হয়। এতে পাহাড়ের ভেতরে পানি গিয়ে উপরের অংশটা ভারী হয়ে যায়। তিনি বলেন, সমপ্রতি যেসব পাহাড়ে ধস হয়েছে, সেগুলো আর নতুন করে ধসের ঝুঁকি নেই। তবে অন্য পাহাড়গুলোতে ধসের ঝুঁকি রয়েছে। ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, পাহাড়ে যাতে বৃষ্টির পানি না ঢুকে সে ব্যবস্থা করতে হবে। আর পানি ঢুকলে ড্রেনের মাধ্যমে পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, পাহাড় ও পাহাড় সংশ্লিষ্ট এলাকায় এখন থেকে কোনো রাস্তা করতে হলে  অবশ্যই ভূতত্ত্ববিদদের পরামর্শ নিতে হবে।

জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী জানান, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের পাহাড় থেকে সরিয়ে পুনর্বাসনের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গসহ সকল পর্যায়ের লোকজনের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে উদ্বুদ্ধকরণের কাজ চলছে। সম্প্রতি তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপক পাহাড় ধসের ঘটনায় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে আগামীকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রামে সরকার উচ্চ পর্যায়ের সেমিনারের আয়োজন করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতে বালুর আধিক্য থাকায় বন-জঙ্গলবিহীন কাটা পাহাড়ের মধ্যে পানি সহজে প্রবেশ করতে পারে। পানি ঢুকে বালুর লুজ বন্ডিংয়ের কারণে পাহাড় ধসের আশংকা বেড়ে যায়। ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামে প্রবল বর্ষণের ফলে ১২৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। সম্প্রতি তিন পার্বত্য জেলাসহ চট্টগ্রামে ব্যাপক পাহাড় ধসের ঘটনায় দেড় শতাধিক মানুষ নিহত হন।  পাহাড় ধসের পর রাঙ্গামাটির সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ এখনও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়নি। ২০০৭ ও ২০১৭ সালের এ দু’টি বিপর্যয়ের মূল কারণ হচ্ছে অতিবর্ষণ, পাহাড় কাটা এবং পাহাড়ে গড়ে উঠা ঘর-বাড়ি। ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম মহানগরীতে পাহাড় ও ভূমি ধসের পর উচ্চ পর্যায়ের পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটি পাহাড় ধস রোধে ৩৬ দফা সুপারিশমালা পেশ করে। কিন্তু দীর্ঘ ১০ বছরেও তার ন্যূনতম বাস্তবায়ন হয়নি।

ইত্তেফাক/নূহু