সিলেটের বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বিগত এক মাসের স্থায়ী বন্যায় প্রতিদিনই নতুন-নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। দুই উপজেলায় পানিবন্দি লোকজনের সংখ্যা প্রায় চার লাখে দাঁড়িয়েছে। পানিবন্দি লোকজনের মধ্যে বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ত্রাণের জন্য বাড়ছে আহাকার। গো-খাদ্যের চরম সংকট। বন্যার্ত লোকজনের মধ্যে দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগ। বন্যাদুর্গত এলাকায় পানি বিশুদ্ধকরণ ও রোগ-বালাই দমনে সরকারি হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের কোনো তত্পরতা নেই। অভিযোগ রয়েছে- সংশ্লিষ্ট এলাকার স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্গত মানুষের কাছে না গিয়ে ওষুধসামগ্রী বিতরণের নামে ফটোসেশন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান দিচ্ছেন।
বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রদীপ সিংহ বলেন, বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য ১২ টন চাল, সাড়ে ২৪ হাজার টাকা বরাদ্দ এসেছে, যা বিতরণের প্রক্রিয়া চলেছে। সে হিসেবে বালাগঞ্জ উপজেলায় প্রায় দুই লাখ বন্যার্ত মানুষের বিপরীতে ১২ হাজার ৯৬০ কেজি চাল। এই চাল হতদরিদ্র লক্ষাধিক বানভাসি মানুষের মধ্যে বিতরণ করলে মাথাপিছু পড়বে ১২৯ গ্রাম করে। ওসমানীনগর উপজেলায় ৮ টন চাল ও ৩৬ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। ওসমানীনগরের প্রায় দুই লাখ বন্যার্ত মানুষের বিপরীতে ১২ হাজার ৯৬০ কেজি চাল। এই চাল হতদরিদ্র লক্ষাধিক বানভাসি মানুষের মধ্যে বিতরণ করলে মাথাপিছু পড়বে মাত্র ৮৬ গ্রাম। এই বরাদ্দ বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর উপজেলার বানভাসি চার লক্ষাধিক লোকের মধ্যে শুধু হতদরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করলেও প্রতিজন পাবে প্রায় ১০৮ গ্রাম চাল। বানভাসি মানুষের বরাদ্দ নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের প্রচারনায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বানভাসি লোকজনের অভিযোগ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা কোনো ত্রাণ সহায়তা না দিয়ে শুধু আশ্বাস আর প্লাবিত এলাকায় গিয়ে ফটোসেশন করছেন। গত শনিবার বালাগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বন্যার্তদের মধ্যে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আবদাল মিয়া তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৩৬ হাজার টাকা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা চাল বিতরণ করেছেন।
বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলার ১৮১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬০টি ও ৩০-৪০টি মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল ও মাদরাসা বন্যা কবলিত হওয়ায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ স্কুল শিক্ষার্থীশূন্য থাকায় পাঠদান বন্ধ থাকলেও কর্মরত শিক্ষিকদের কর্তৃপক্ষের ভয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পানি সাঁতরে স্কুলে গিয়ে পানির মধ্যে বসে অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে। বালাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদাল মিয়া বলেন, বালাগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী ওসমানীনগর উপজেলার বাসিন্দারা পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
হাকালুকি হাওরে পানি বেড়েছে, অপ্রতুল ত্রাণ
কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, হাকালুকি হাওরে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার দুইটি ইউনিয়নে ১০ হাজার পরিবারের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ঘরে পানি ওঠায় এবং ঝড়ো বাতাসে কাঁচা বাড়িঘর ভেঙে পড়ায় অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। অনেকে ঝুঁকির মধ্যে পানিবন্দি অবস্থায় বাড়িতে গৃহপালিত পশু নিয়ে অবস্থান করে বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছেন। পানিবন্দি মানুষের বক্তব্য পর্যাপ্ত কাঁঠাল থাকলে তারা কাঁঠাল খেয়ে জীবন ধারণ করতেন। এখন কাঁঠালের শেষ মৌসুম, কাঁঠাল শেষ হয়ে আসছে, দামও বেড়েছে, তাই কাঁঠালের ধারে-কাছে যাওয়া যাচ্ছে না।
জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাকালুকি হাওর-সংলগ্ন জায়ফরনগর ও পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের ২২টি গ্রাম সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। উজান থেকে সুনাই, ষাটমা, জুড়ী ও কন্টিনালা নদী ও বিভিন্ন ছড়া দিয়ে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হাকালুকি হাওরে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে, নতুন করে অনেক বাড়িঘর তলিয়ে যাচ্ছে। পানি বৃদ্ধির কারণে জায়ফরনগর ইউনিয়নের বেলাগাঁও, সোনাপুর, শাহাপুর, রাজাপুর, নিশ্চিন্তপুর, গোবিন্দপুর, জাঙ্গিরাই, নয়াগ্রাম, শিমুলতলা, ইউসুফনগর ও পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের বাছিরপুর, আমতৈল, খালেরমুখ, খাগটেকা, তালতলা, কালনিগড়, হরিরামপুর, কৃষ্ণনগর গ্রামগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সকল গ্রামের রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। চলাচলের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নৌকা। যাদের নৌকা নেই তারা গৃহবন্দি হয়ে পড়েছেন।
জুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিন্টু চৌধুরী জানান, বন্যাদুর্গত এলাকার জন্য ৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২১টি পরিবার অবস্থান করছে। তাদের শুকনো খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৫০ টন জিআর চাল ও ১ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। এগুলো বিতরণ চলছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সাহায্য অব্যাহত আছে। জুড়ী উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মনি কিশোর চৌধুরী জনান, বন্যার ফলে কুলাউড়া-জুড়ী, জুড়ী-বড়লেখা, জুড়ী-ফুলতলা সড়ক যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। শনিবার রাতে কুলাউড়া জুড়ী সড়কে ঢাকাগামী যাত্রীবাহী ‘রূপসী বাংলা’ ও একটি চালবোঝাই ট্রাক ঝুঁকি নিয়ে পানির মধ্যদিয়ে চলাচলকালে রাস্তার খাদে পড়ে বিকল হয়ে যায়। জুড়ী উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রঞ্জন কুমার সাহা জানান, উপজেলার বন্যা-কবলিত ২টি ইউনিয়নের ২১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। বিদ্যালয়গুলো হল: তালতলা খাকটেকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কালনীগড়, বাছিরপুর, হরিরামপুর, উত্তর ভবানীপুর, উত্তর জাঙ্গীরাই, দক্ষিণ জাঙ্গীরাই, নয়াগ্রাম, নয়াবাজার, ভুকতেরা, বেলাগাঁও, পূর্ব বেলাগাঁও, শাহাপুর, নিশ্চিন্তপুর, ভুয়াই, দিগলভাগ, পশ্চিম গোবিন্দপুর, ভবানীপুর, কৃষ্ণনগর, ধামাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নয়াবাজার শিশুকল্যাণ সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র। তিনি জানান, বর্ষণ বন্ধ হলেও পানি নামতে সময় লাগবে।
সিলেটে সাড়ে ৩ লাখ
মানুষ পানিবন্দী
সিলেট অফিস জানায়, সিলেটের সাত উপজেলায় সাড়ে তিন লাখ লোক পানিবন্দী হয়ে দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে। ফেঞ্চুগঞ্জে টিলা ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সুরম-কুশিয়রা দুটি নদীর সবকটি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর পানি অমলশীদ পয়েন্টে ৮৫ সেমি , শেওলা পয়েন্টে ৭৩ সেন্টিমিটার এবং শেরপুর পয়েন্টে ২৪ সেন্টিমিটার বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এছাড়া সুরমা নদীর পানি কানাইঘাটে বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেটে আবহওয়াবিদ সাঈদ চৌধূরী জানান, আগামী ৭ জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি প্রবল বৃষ্টি পাতের করণে টিলা ধসেরও আশঙ্কা করছেন। জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ জকিগঞ্জ উপজেলায় বন্যা দেখা দেয়। সরকারী সূত্র জানায়, সারা জেলায় ১৪৮ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠাান বন্ধ হয়ে গেছে বন্যার কারণে।
তিস্তার পানি বিপদসীমার
১০ সেন্টিমিটার উপরে
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা ব্যারাজের দোয়ানি পয়েন্টে গতকাল আবারো পানি বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আমিনুর রশীদ। তিস্তার পাড়ের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে জেলার ১৫ হাজার চরবাসী পানি বন্দি রয়েছে।
মৌলভীবাজারে ১৮৪টি
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জন্য বন্ধ
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, জেলায় তৃতীয় দফা বন্যার সার্বিক পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। জেলা সদরের সাথে বড়লেখা উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। জেলায় মোট ১৪২টি প্রাথমিক স্কুল ও ৪২টি মাধ্যমিক বিদ্যালসহ মোট ১৮৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত খোলা হয়েছে ২৯টি বন্যা কবলিত মানুষের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র।
ইত্তেফাক/নূহু
