ফয়সালের বয়স ৭ বছর। ছোট বোন সাইমার বয়স ৪ বছর। তাদের বাড়ি পিরোজপুরের কঁচা নদীর তীরে চরখালী গ্রামে। দুজনেই মোবাইল ফোনে ডাউনলোডকৃত ভারতীয় সিরিয়াল ‘রাখি বন্ধন’ দেখায় ব্যস্ত। এসময় তাদের মামা নতুন জামা নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। নুতন জামা তাদের দেয়ার জন্য অনেক ডাকাডাকির পরেও মামার কাছে আসে নাই তারা। এভাবেই মোবাইল ফোনের আসক্তির ফলে পারিবারিক বন্ধন হালকা হচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ।
ফয়সাল সাইমার মত করেই গ্রামীণ শিশুদের মাঝে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে মোবাইল ফোন আসক্তি। খেলাধুলার পরিবর্তে মোবাইল ফোনে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও দেখা ও গেমের প্রতি ঝুঁকছে তারা। সাধারণত গ্রাম অঞ্চলে ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক দূর্বল। ফলে সরাসরি ইন্টারনেট থেকে কোন কিছু ডাউনলোড করার ক্ষেত্রে বেগ পেতে হয় ব্যবহারকারীদের। এ সুযোগে গ্রামীণ হাট বাজারে গড়ে উঠেছে গান ভিডিও লোডের দোকান। যে সব দোকানে উচ্চ শব্দে সারাদিন গান চালান হয়। এই দোকানগুলোতে একটি কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকে স্বল্প বয়সী দোকানি। সেখানে গান, গেম, কার্টুনসহ বিভিন্ন ভারতীয় চ্যানেলে প্রচারিত সিরিয়াল মেমোরি কার্ডে লোড করে দেয়া হয়। প্রতি গিগাবাইট ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে লোড করা হয়। এসব দোকানিদের আপডেটেট সব গান, গেম, কার্টুনসহ ভারতীয় সিরিয়াল সরবরাহ করে বিভাগীয় শহরের ব্যবসায়ীরা। গ্রামীণ ব্যবসায়ীরা একশ জিবি ডাটা এক’শ থেকে দেড়’শ টাকায় কিনে থাকে বলে জানিয়েছেন ইন্দুরকানীর জনপ্রিয় লোড ব্যবসায়ী নাঈম আকন।
তিনি আরও জানান, ‘অভিভাকেরা শিশুদের শান্ত রাখার জন্যই দোকানে এসে পটলকুমার গানওয়ালা, রাখি বন্ধন, আহট, গোপালভাড়, মোটুপাতলু, চাঁদের বুড়ি, ডরিমনসহ বিভিন্ন সিরিয়াল লোড করে দিতে বলে।’ ফলে ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে দেশীয় সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এই সকল শিশুরা।
শিশুদের খাওয়া, ঘুম ও গোসলের সময় মোবাইল ফোনে পছন্দের ভিডিও চালিয়ে রাখতে হয়। না হলে কোন কিছুতেই সায় দেয় না মোবাইল ফোন আসক্ত শিশুরা। খাদিজা নামের এক শিশুর মা বলেন, আমার সন্তান কার্টুন না চালিয়ে দিলে ভাত খায় না।
পড়ালেখার পাশাপাশি বিনোদন খুবই জরুরি। মোবাইল আসক্তির ফলে খেলাধুলা বা শারীরিক কসরত ব্যাহত হচ্ছে। মোবাইল ফোনে গেম খেলা বা বিভিন্ন ধরনের ভিডিও দেখে সময় নষ্ট করছে এই শিশুরা। তাই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
ইন্দুরকানী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নুরুল হুদা জানান, ‘বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে প্রভাবিত হচ্ছে শিশুরা। এটি বন্ধে কেন্দ্রীয় ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় ভাবে কোন স্কুলে যাতে কোন শিক্ষার্থীরা ফোন ব্যবহার না করতে পারে সে জন্য আমার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আগামীতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের নিয়ে আমরা সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে বিশেষ সভার আয়োজন করব।’
ইন্দুরকানী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সেকান্দার আলী খান জানান, শিশুদের মোবাইল আসক্তির ফলে পড়ালেখার উপরে প্রভাব পড়ছে। অনেক শিশু শিক্ষার্থীরা হোম ওয়ার্ক ঠিক ভাবে করে না। অধিকাংশ সময় মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে এমন অভিযোগ আমাদের কাছে অনেক। আবার খেলাধুলাও ঠিক ভাবে না করার ফলে শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে।
ইন্দুরকানী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শাকিল আহম্মেদ খান জানান, ‘অতিরিক্ত মোবাইল ফোনের ব্যবহার শিশুদের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। খুব কাছ থেকে ভিডিও দেখার ফলে শিশুদের চোখের সমস্যার সৃষ্টি করে। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক রেডিয়েশন মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া অন্য মনস্ক হয়ে খাবার খেলে বদহজম হওয়াটা স্বাভাবিক। তাই শিশুদের খাওয়ার সময় মোবাইল ফোন বা টিভি না দেখাই ভাল। শিশু রোগবৃদ্ধির ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি অনেকটাই দায়ী। অভিভাবকদের বেশি করে সন্তানদের সময় দেয়া প্রয়োজন। শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির জন্য খেলাধুলার ব্যবস্থা করা দরকার। যতটা সম্ভব মোবাইল ফোন থেকে শিশুদের দূরে রাখাই ভাল। তাই অভিভাবকদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি খুবই জরুরি।’
ইত্তেফাক/এমআই
