উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া অধিকাংশ নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তা-ঘাট, ফসলি জমি। বগুড়ার ধুনট উপজেলায় বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে এক স্কুল ছাত্র। সিলেটে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। কক্সবাজারে পানি কমতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে বন্যার ক্ষত। সব জায়গাতেই বাড়ছে ভাঙনের তীব্রতা।
গাইবান্ধার প্রতিনিধি জানান, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, যমুনা, করতোয়া ও ঘাঘটসহ সবগুলো নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। রাস্তা-ঘাট, ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। রবিবার ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বিপদসীমার ১৪ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় করতোয়া নদীর পানি গোবিন্দগঞ্জের কাটাখালি পয়েন্টে ১০ সে.মি ও ঘাঘট নদীর পানি গাইবান্ধা শহর পয়েন্টে ৫ সে.মি. বৃদ্ধি পেলেও এখনো বিপদসীমার নিচে রয়েছে। এদিকে জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে জরুরিভাবে ১২৫ মে. টন চাল ও ৪ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে তিস্তা নদীতে পাইলিং ও জিও ব্যাগ ফেলেও তীব্র ভাঙন প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সীমান্তের ওপার থেকে আসা ঢলের পানিতে মরা তিস্তা নবযৌবন ফিরে পেয়েছে। তীব্র আক্রোশে ভাঙছে দুই তীর। তিস্তার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের বিদ্যানন্দ বাজার, বিদ্যানন্দ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মসজিদ ও শতাধিক পরিবারের বসতভিটা, গাছপালা শতশত একর ফসলি জমি। কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাইলিংয়ের কাজ চললেও ভাঙনের তীব্রতার কারণে এখনো ভাটিতে অস্থায়ী পাইলিংয়ের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি, পাইলিং দেওয়া হলেও টিকবে কিনা এনিয়ে আমি সন্দিহান, তবে উজানে অস্থায়ী পাইলিংয়ের কাজ চলছে।
বগুড়া অফিস জানায়, বগুড়ায় যমুনা নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনায় পানি ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে রবিবার বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বগুড়া জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যা কবলিত সারিয়াকান্দি ও সোনাতলায় ৭০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
ধুনট (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, যমুনা নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় বগুড়ার ধুনট উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সহকারী প্রকৌশলী হারুনর রশিদ বলেন, যমুনা নদীর পানি বেড়ে রবিবার শহড়াবাড়ি ঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অভ্যন্তরে ১১ গ্রামের প্রায় তিন হাজার পরিবার। আনারপুর গ্রামের বিলের পানিতে পড়ে মহাব্বত হোসেন নামে এক শিশু শিক্ষার্থী মারা গেছে। মহাব্বত হোসেন আনারপুর দহপাড়ার দুলু মিয়ার ছেলে এবং আনারপুর-কচুগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, যমুনা নদীর পানি বেড়ে ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নের রাধানগর ও বৈশাখী চরের আউশ ধান, আখ, পাট ও শাক-সবজিসহ প্রায় ৯৫ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা নিমজ্জিত হচ্ছে।
সোনাতলা (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, বগুড়ার সোনাতলায় যমুনায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পাট ও বীজতলাসহ এ পর্যন্ত ৫৩৫ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান জানান, তেকানী চুকাই নগর ও পাকুল্যা ইউনিয়নের ১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বন্যা পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যমুনার চর এলাকার ২৭টি ইউনিয়নই বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। সিরাজগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ হাসান ইমাম জানান, উজান থেকে পানি এখনো ধেয়ে আসছে। এই ধারা আর কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটেনি। এ দিকে বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের ১০ হাজার বিঘা গোচারণ ভূমি ও শতাধিক গরুর বাথান বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। ফলে গো-খামারিরা তাদের শত শত গবাদি পশু বাথান এলাকা থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। এ সব গরু এখন খামারিদের বাড়ির আঙ্গিনা ও গোয়াল ঘরে বন্দিদশায় রয়েছে। কাঁচা ঘাসের অভাবে দুগ্ধ উত্পাদন কমে গেছে। অপর দিকে, বাজারে খইল, ভুসি ও দানাদার খাদ্যের দাম বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় খামারিরা চরম বিপাকে পড়েছেন।
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, যমুনা নদী ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অপরিবর্তিত রয়েছে। বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে রবিবার যমুনা নদীর পানি ১ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৬ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে সার্বিক বন্যার পরিস্থিতি আরো অবনতি ঘটেছে। জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী উপজেলায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে সারা জেলায় ২২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া আরো প্রায় ১০টির অধিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ উঁচু বাঁধে কিংবা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। মানুষের খাদ্যের পাশাপাশি গো-খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, প্রবল বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার জেলার আট উপজেলায় দেড় সহস্রাাধিক ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, চিংড়িঘের ও মত্স্য খামার, মুরগি ফার্মসহ ৯০০ গ্রাম প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার। ব্রিজ-কালভার্ট, সড়ক বিধ্বস্ত হয়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে দুর্গতদের।
জানা যায়, বন্যায় ঘরবাড়ি, গবাদি পশু ও ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন চকরিয়া, কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, পেকুয়া, কুতুবদিয়া ও রামু উপজেলার প্রতিটি পরিবার। তবে শুক্রবার থেকে বৃষ্টি না হাওয়ায় আস্তে আস্তে পানি নামছে। দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। আর উঁচু এলাকাসহ নিরাপদ স্থানে সরে আসা দুর্গত মানুষগুলো বাড়ি ফিরে পড়েছে চরম দুর্ভোগে।
চকরিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, কক্সবাজারের চকরিয়ায় বন্যার তাণ্ডবের পর এখন নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে পৌরশহর রক্ষা বাঁধ ও ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের ঘুনিয়া পয়েন্টের বেড়িবাঁধ। মাতামুহুরী নদীতে ঢলের পানি প্রবাহ কমে যাওয়ার পর থেকে দুই তীরে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙন। ইতোমধ্যে গত কয়েক দিন আগে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে চকরিয়া পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শহররক্ষা বাঁধ এলাকার গনী সিকদারপাড়া গ্রামের অন্তত ১২টি বসতঘর ও বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি। বর্তমানে নদীতে হেলে পড়েছে ৬টি বিদ্যুত লাইনের খুঁটি।
সিলেট অফিস জানায়, সিলেটে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে কমলেও কোনো কোনো স্থানে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত। এদিকে, গতকালও সিলেটে প্রচুর বৃষ্টিতে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। গতকাল রবিবার দুপুরে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, কানাইঘাটে সুরমা বিপদসীমার ৫০ সে.মি. ও অমলসীদে কুশিয়রা ৮০ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। অন্যন্য পয়েন্টে নদী বিপদসীমার নিচে নেমে এসেছে। তবে প্রতিকূল আবহওয়া বানভাসি মানুষের মনে প্রতিনিয়ত শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
ইত্তেফাক/নূহু
