অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব কৃষ্ণ গোপাল রায় একজন মুক্তিযোদ্ধা। লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাটা ইউনিয়ন এলাকার ছেলেবুড়ো সবাই জানেন তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠকও। মুক্তিবার্তায়ও তার নাম রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বৃহত্তর রংপুর এলাকা থেকে মুক্তিকামী কিশোর ও যুবকদের তিনি ভারতের কুচবিহারে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে যেতেন। অথচ এই মুক্তিযোদ্ধাকেই কিনা গত ১৫ মে লালমনিরহাট জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলে ঘোষণা দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের ৭ সদস্যের যাচাই-বাছাই কমিটি ৫৯ জনকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে সনাক্ত করেছে। এই তালিকায় ৫৭ নম্বরে কৃষ্ণ গোপাল রায়ের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি লালমনিরহাট সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একপত্রে কৃষ্ণ গোপাল রায়কে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের কাছে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তাঁর সকল সনদ ও প্রমাণপত্র জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। সে অনুযায়ী কৃষ্ণ গোপাল রায় ১৭ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত তাঁর সকল সনদ ও প্রমাণপত্র জেলা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে জমা দেন।
লালমনিরহাট জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের কমান্ডার মেজবাহ উদ্দিন বলেন, কৃষ্ণ গোপাল রায় মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির কাছে মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক হিসাবে দাবি করেছেন। আমরা এই কমিটি মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই করছি। এ কারণে তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসাবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন’। তিনি কোথাও মুক্তিযুদ্ধ করেননি। এমনকি তত্কালীন তাঁর নাবালক বোন মুক্তি রানী রায়কে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তিনি করেছেন। তাঁর বোনের সে সময় বয়স ছিল ৩ বছর। তিনি কমিটির কাছে দাবি করেছেন যে তাঁর বোনকে কোলে নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের কাজ করেছেন।
এ ব্যাপারে লালমনিরহাট সদর উপজেলার ইউএনও শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির আমি একজন সদস্য সচিব। কৃষ্ণ গোপাল রায়ের সব কাগজপত্র সঠিক। তারপরও স্থানীয় রাজনীতির কারণে তিনি চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। এ কারণে তাঁকে আমি পরামর্শ দিয়েছি বিষয়টি তিনি যেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে জানান। কৃষ্ণ গোপাল রায় অভিযোগ করেন, জেলায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরোধিতা করায় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল পরিকল্পিতভাবে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা সনদ যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়। অথচ যেসব মুক্তিযোদ্ধার নাম মুক্তিবার্তায় রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য নয়। পরবর্তীতে তার নাম ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় টানিয়ে দেয়া হয়েছে।
গতকাল কৃষ্ণ গোপাল রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর তিনি ১৯৭৩ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসাবে যোগ দেন। ওই সময় বিসিএস কর্মকর্তা হিসাবে যারা তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের প্রায় সকলের একে একে পদোন্নতি হয়। কিন্তু তাঁর পদোন্নতি দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয় শুধু মুক্তিযোদ্ধা হওয়া কারণে। সর্বশেষ জোট সরকারের আমলে ২০০৬ সালে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে যুগ্মসচিব হিসাবে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। অদৃষ্টের পরিহাস যে আমাকে সেই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে সনাক্ত করা হলো।
জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় কৃষ্ণ গোপাল রায় রংপুর কারমাইকেল কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন। ’৭১ এর ৭ এপ্রিল রংপুরের ১২ জন ছাত্রনেতার সঙ্গে লালমনিরহাট সীমান্ত পার হয়ে ভারতের কুচবিহারের দিনাহাটা এলাকায় যান। সেখানে তত্কালীন ফরোয়ার্ড ব্লকের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী কমল গুহের নির্দেশনায় উত্তর-পূর্ব মুক্তি পরিষদ গঠন করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে কৃষ্ণ গোপাল রায়ের তত্কালীন এম এন এ রিয়াজ উদ্দীন আহমেদ ভোলা মিয়ার প্রত্যয়নপত্র আছে। স্বাধীনতার পর তত্কালীন এমপি আবুল হোসেনের প্রত্যয়নপত্রও রয়েছে তাঁর কাছে। পাশাপাশি মুক্তিবার্তায় (০৩১৪০১০০২২) তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত গেজেটেও তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত (নম্বর-২০০৮, তারিখ-২৬-১২-২০১১) । এছাড়া রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত সনদ ( নম্বর-২১৮৬৯)।
