আইলার আট বছর পরও সংস্কার হয়নি বাঁধ ভাঙন, আতঙ্কে উপকূলবাসী

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০১৭, ০৪:০১

রাত্রি শুয়ে থাকলি দু’চোখের পাতা এক করতি পারিনে। মনে হয় কখন আবার ওয়াপদা ভেঙলো আর আমরা পানতি ভাসলাম। আক্ষেপভরা কথাগুলো শেষ করেই রবিউল ইসলাম জানান, আমারগো ইউনিয়ন চতুর্দিক থেকে বাঁধ দেওয়া। কখন আবার কোন্ এলাকা ভাঙে তানে চিন্তাই থাকতি হয়। বার বার ওয়াপদা ওয়ালাগো ও চেয়ারম্যান, মেম্বরেরা বলেও কোনো কাজ হচ্ছে না বলে অভিযোগ তার।

শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চাঁদনীমুখা গ্রামের রবিউল ইসলামের মত এমন অভিযোগ গোটা এলাকাবাসীর। তাদের আক্ষেপ আইলার মত এতোবড় প্রলয়ের পর শুধুমাত্র ভাঙনকবলিত অংশ মেরামত ছাড়া বাঁধের উচ্চতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এছাড়া প্রাথমিকভাবে পানির প্রবেশ ঠেকাতে ভাঙনকবলিত অংশ মেরামতের পর তা সংরক্ষণের বিষয়ে গত আট বছরেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

আইলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গাবুরা ঘুরে দেখা গেছে, উপকূল রক্ষা বাঁধের কোনো কোনো অংশ রীতিমত সরু আইলে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত আছড়ে পড়া ঢেউয়ের আঘাতে তা মুহূর্তেই নদীতে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়। আইলার পর থেকে কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে বাঁধকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হলেও দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনার ছাপ লক্ষ্য করা যায়নি সেখানে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পাশের কপোতাক্ষ নদের আছড়ে পড়া ঢেউয়ের আঘাতে পূর্ব নেবুবুনিয়া, গাগড়ামারি, নাপিতখালি আর ডুমুরিয়া এলাকায় ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আইলার পর বেসরকারি সংস্থা কারিতাসের পক্ষ থেকে বসতঘর বরাদ্দ দেওয়া হলেও ইতোমধ্যে নতুন ভাঙনের কবলে পড়ে নদীতে বিলীন হয়েছে মারুফা বেগমের বসতঘর।

নেবুবুনিয়া গ্রামের ফতেমা বেগম জানান, আইলার পর থেকে তার বসতঘর তিনবার সরিয়ে নিতে হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আইলার সময় ভাঙনকবলিত অংশের ভিতর দিয়ে রিং বাঁধ দেওয়ার পর গত আট বছরে সেখানে এক কোদাল মাটি না দেওয়ায় ঐ অংশের বাঁধ ভেঙে সরু আইলে পরিণত হয়েছে। পার্শ্বেমারী গ্রামের বৃদ্ধ আফতাব মোড়ল জানান, আইলার সময় ভিতর দিয়ে আড়াআড়ি বাঁধ দিতে গিয়ে তার তিন বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। এবার ভাঙলে বসতভিটাসহ বাকি দু’বিঘা জমিও হারিয়ে পথে নামতে হবে। আইলার সময় পানির প্রবেশ ঠেকাতে যে মাটি ফেলা হয় তার বাইরে এতোদিনে বাঁধের ওপর বা পাশে  কোনো মাটি দেওয়া হয়নি।

পার্শ্বেমারী ও জেলেখালী এলাকায় পৌঁছে দেখা যায় ভাঙন ঠেকাতে সেখানে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। কিন্তু বাঁধের উচ্চতা না বাড়িয়ে ওইভাবে জিও ব্যাগ ফেলার কারণে নদীতে স্বাভাবিকের তুলনায় জোয়ারে পানি বাড়লে সংলগ্ন এলাকা প্লাবিত হতে পারে বলে দাবি বৃদ্ধ ইসমাইল হোসেনের। তিনি জানান, আইলার পর বাঁধের উপর কোনো মাটি পড়েনি। আর দুই ফুট মাটি দিয়ে তারপর জিও ব্যাগ ফেললে কপোতাক্ষের ভয়াবহতা থেকে হয়তবা গাবুরাকে রক্ষা করা যেতো। গ্রামবাসীদের অভিযোগ: পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন মাঝে মধ্যে তাদের এলাকা পরিদর্শনে যাওয়ার পর বার বার বাঁধ উঁচু করা ও ভাঙনকবলিত স্লুইস গেটগুলো সংস্কারের দাবি জানানো হয়। কিন্তু বাজেট নেই, সরকারের বরাদ্দও নেই- জানিয়ে তারা দিব্যি গা বাঁচিয়ে চলে। ফলে আইলার আট বছর পরও সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলে থাকার পরিবর্তে নতুন করে প্লাবন আতঙ্কে রয়েছে তারা।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাতক্ষীরা পওর শ্যামনগর অঞ্চলের ১৫ নং পোল্ডারের দায়িত্বে থাকা মাসুদ রানা জানান, গাবুরা ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত এলাকার বিষয়ে ওপরে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। ঈদের পরে বাজেট আসতে পারে। বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু করা হবে।

ইত্তেফাক/নূহু