জ্যোত্স্না তঞ্চঙ্গ্যা
প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, ‘সত্ মানুষ মাত্রই নিঃসঙ্গ, আর সকলের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু।’ আমার মতে, অধিকাংশ সত্ মানুষ সহজ-সরল আর আচরণে হন বিনয়ী। কিন্তু সত্ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে কিছু সুবিধাবাদী অমানুষ নিজের আখের গোছায়। পরিণতিতে সমাজের চোখে ভালো মানুষের গুরুত্ব কমে যায়।
আসলে বর্তমান বিশ্বে মানুষের আচরণের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। সহজাত প্রবৃত্তিরও ঘটেছে রূপান্তর। অনেক ক্ষেত্রে সুস্থ ও সুশৃঙ্খল পরিবারের সন্তানরাও নানা ধরনের কুপ্রবৃত্তিতে মেতে উঠছে। পারিবারিকভাবে নীতি-আদর্শ লালন করে আসা ব্যক্তিরাও কূপমণ্ডুকতা ও সংস্কার বিশ্বাস থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না। কারণ স্মার্টফোন ও ব্রডব্যান্ড প্রযুক্তির আধুনিক ছোঁয়ায় মানুষ বিশ্রামের সময় হারিয়েছে, হারিয়েছে জীবনের প্রশান্তি ও স্নিগ্ধতা। ফলে মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে দুশ্চিন্তা ও হতাশা। এতে তার আচরণেরও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সন্ত্রাস, হানাহানি, নৈরাজ্য মানব ইতিহাসের চিরায়ত সত্য এবং চলমান ঘটনা। সঙ্গী, বাসস্থান এবং খাবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ আয়ত্তে আনা ও তা ধরে রাখার জন্যই এই নেতিবাচক আচরণ করে থাকে মানুষ। আবার কেউ কেউ ইভটিজিং, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, শ্রমিক নির্যাতন প্রভৃতি অপরাধে এবং অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অতিমাত্রায় লিপ্ত থাকে। মিথ্যা বলা মহাপাপ—এটা সর্বজনবিদিত হলেও অধিকাংশ মানুষ একে অপরের সম্পর্কে মিথ্যা কথা ও মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করে। মিথ্যার সঙ্গেই যেন আমাদের নিত্য বসতি। শতকরা ৬০ ভাগ মানুষ কথা বলার সময় প্রতি ১০ মিনিটে অন্তত একটি মিথ্যা কথা বলে। যদিও মিথ্যা বলা সহজ কাজ নয়, সত্য বলার চেয়ে এতে ৩০ ভাগ সময় বেশি লাগে। বর্তমানে ফেসবুক, ই-মেইল ইত্যাদি সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এ মিথ্যা বলা বেশি ছড়াচ্ছে।
মিথ্যা বলার মূল কারণ কিছু মানসিক সমস্যা। এক ধরনের হীনমন্যতা থেকে মানুষ মিথ্যা বলে থাকে। পরনিন্দা, পরচর্চা ও অপরকে ছোট করে দেখানোর জন্যও অনেকে মিথ্যা বলে। মানুষের জীবনে সামাজিক অপরাধ ক্রমাগত বাড়ছে। ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে হর-হামেশায়। বন্ধুত্বের সম্পর্কের মধ্যেও নানা হানাহানি ও অবিশ্বাস। কর্মস্থলে একজনের দ্বারা অপরকে ধোঁকাবাজি দেওয়া নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সময়ে অন্যের সমালোচনা করা প্রায় প্রতিটি মানুষের এক সহজাত স্বভাব হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবে মানুষ একে অন্যের সঙ্গে গালগল্প করে। একে অন্যের খুঁত বের করে এবং এতে মানবমনে কোনো দুঃখবোধও জাগে না। একে অপরের সমালোচনায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আঠার মতো লেগে থাকে কেউ কেউ। ফলে সামাজিক বিরোধ, হানাহানি ও অস্থিরতা তৈরি হয়।
অফিসের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে নিম্নপদস্থ কর্মকর্তার ভালো সম্পর্ক থাকলে সেই সম্পর্ককে কেউ কেউ সুবিধাবাদের বা সুবিধাগ্রহণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারে। কেউ হয়তো পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে নারী কর্মীর অবৈধ সম্পর্ক আবিষ্কারে মেতে ওঠে। এসবের মধ্যে আছে হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা—যে হিংসার কারণে আমাদের পার্বত্য এলাকাও মাঝেমধ্যে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে; যে পরশ্রীকাতরতার জন্য হামলা চলে সুখী মানুষের গৃহে। এই যে মানসিকতা এটি এক ধরনের সামাজিক ব্যাধি। এ ব্যাধিটিও আমাদের অভ্যাসগত। অথচ এই অভ্যাস সহজেই দূর করা সম্ভব।
একসময় ধর্মীয় পরিচয়, নৃতাত্ত্বিক অবস্থান, পদমর্যাদা ও ক্ষমতার কারণে মানুষের সঙ্গে মানুষের আচরণগত পার্থক্য হতো। কিন্তু এখন ডিজিটাল যুগে একজন ব্যক্তি সহজেই আরেকজনকে খুঁজে পাচ্ছে। বিচ্ছেদ ঘটলে কিংবা হারিয়ে গেলেও যোগাযোগ পুনরায় গড়ে উঠছে। ফলে মানবমনের সহজাত প্রবৃত্তিগুলো দ্রুত ওঠানামা করছে থার্মোমিটারের পারদের মতো।
আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি—কিছু নারী/পুরুষ কর্মী আছে যারা অন্যের কষ্টে পীড়া অনুভব করে না। তারা সকলের জীবনেই খুব সূক্ষ্নভাবে হলেও খবরদারি করতে চায়। অন্যের জীবনে নিজের ইচ্ছা খাটাতে আগ্রহী। তারা নিজের স্বার্থ উদ্ধারে যে কোনো সীমা অতিক্রম করতে পারে। খারাপ বা নীচ আচরণ তাদের জন্য কোনো ব্যাপার নয়। নিজের খারাপ কাজের জন্যেও তারা কখনোই অনুতপ্ত হয় না; বরং এসব কাজকে খারাপ মনেও করে না। তারা কৌশলে দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। নিজের দায়িত্ব অন্যের ওপরে চাপিয়ে দেয়। মনে রাখতে হবে, স্বার্থপর মানুষ কখনোই ভালো বন্ধু হতে পারে না।
জীবনের পথে আমরা দেখতে পাই যারা খারাপ প্রকৃতির মানুষ, তারা সাধারণত অত্যন্ত চালাক হয়ে থাকে। এতটাই ধূর্ত যে, প্রায়ই নিজের খারাপ দিকগুলো আড়াল করে রাখে সেই চালাকির পেছনে। আজ যে মানুষ অন্যের ক্ষতি করল, কাল সে আরেকজনেরও ক্ষতি করতে পারে—এই সত্যটি ভুলে গেলে চলবে না।
উন্নত বিশ্বে দেখা যায়, মানুষ তাদের কাজের সময় দায়িত্ব পালন করা নিয়ে ব্যস্ত থাকে বেশি। কারো পিছনে লাগার সময় তাদের নেই। কে কতটা পেশাদারী মনোভাব নিয়ে কাজ করবে সেটাই হলো সেখানকার দক্ষতা প্রদর্শনের বড় কথা। তারা পরনিন্দা-পরচর্চায় সময় ব্যয় করে না বলেই ওই দেশগুলো আজ উন্নত। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে অবশ্যই হিংসা-বিদ্বেষ, মানুষে মানুষে রেষারেষি, হীন মানসিকতার বদল ঘটাতে হবে। মনে রাখতে হবে, ক্রমাগত বদঅভ্যাস লালন করাটাই বদ অভ্যাস তৈরির প্রধান কারণ। মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অবাধ্যতা, সত্যিকারের ঝুঁকি বুঝতে না পারা এবং ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আসক্তির ফলেই জন্ম হয় বদঅভ্যাসের। মানুষের মধ্যে বিদ্যমান কিছু খারাপ জিন-ই এজন্য দায়ী। মানুষের ভেতর লুকিয়ে থাকা খারাপ স্বভাবই তার আচরণে প্রকাশ পায়। এজন্য আমাদের আচরণ পাল্টাতে হবে। জনৈক বিশিষ্ট ব্যক্তি লিখেছেন, ‘অন্যের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন, এবং সেইরকম মানুষ হয়ে যাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখুন যাদের ভুলগুলো থেকে অন্যেরা শিক্ষা গ্রহণ করেন।’
মূলত ভালো-খারাপ উভয় ধরনের স্বভাব নিয়েই মানুষ তার সমাজে বেঁচে থাকে। তবে আমার দেখা ভালো মানুষের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। এজন্য আমি বেঁচে থাকার সার্থকতা খুঁজতে গিয়ে আশাবাদী হই। খারাপ মানুষের আচরণ দেখে মুষড়ে পড়ি না। অর্থাত্ ‘অপরের কাছ থেকে আমরা যেরকম আচরণ প্রত্যাশা করি আমাদেরও সে রকম আচরণ করা উচিত’— এ কথার সঙ্গে মিলিয়ে পড়া যায় কবি কামিনী রায়ের এই পঙক্তিদ্বয়কে— ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী ’পরে,/ সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।’
লেখক :সরকারি কর্মকর্তা
