মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগস্ট সহিংসতা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৫ লাখ ৮৯ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এদিকে, নারীদেরকে ধর্ষণ এবং পুরুষদের হত্যাযজ্ঞ এখনো অব্যাহত রেখেছে মিয়ানমারের সেনারা। জাতিসংঘ বলেছে, তাদের চিকিত্সকদের কাছে এ সংক্রান্ত প্রমাণাদি রয়েছে। অন্যদিকে, ভারী বর্ষণের কারণে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা ভীষণ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এদের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।
গত শুক্রবার ব্রিটিশ গণমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে জাতিসংঘের চিকিত্সকরা বলেছেন, মিয়ানমারের সেনারা এখনো নারীদের ধর্ষণ ও রোহিঙ্গাদের হত্যা করছে। তারা যৌন সহিংসতায় জখম কয়েকশ’ নারী দেখেছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার মতে, রাখাইন রাজ্যে এখনো সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ ও হত্যা করছে। সংস্থাটির প্রধান জেইদ রা’দ আল-হুসেইন গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওকে বলেন, সেনারা নির্বিচারে গুলি, দ্রুত বিচার করে হত্যাকাণ্ড, অযৌক্তিক গ্রেফতার, গুম, ধর্ষণ এবং সহিংসতা ও নির্যাতনের অন্যান্য পদ্ধতিও প্রয়োগ করছে। তিনি আরো বলেন, মনে হচ্ছে এসব এখনো চলছে। তিনি তার পূর্বের দাবির পুনরাবৃত্তি করে বলেন, বার্মার পরিস্থিতি এখনো ‘জাতিগত নির্মূলের টেক্সটবুক উদাহরণ’ হিসেবেই রয়েছে।
সামপ্রতিক সময়েও জাতিসংঘের চিকিত্সকরা যৌন সহিংসতায় আহত কয়েকশ’ নারী দেখেছেন। জাতিসংঘের এক চিকিত্সক বলেন, যৌনাঙ্গ বির্দীণ হওয়া, কামড়ের দাগ এবং নারীর শরীরে আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশের ক্ষতও তিনি দেখেছেন। রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকে ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা এবং যৌন নিগ্রহের ঘটনায় সাড়ে তিনশর বেশি নারী জীবনরক্ষাকারী চিকিত্সা নেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে। বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানায়, পঁচিশে আগস্টের পর রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে এসেছে প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা। বলা হচ্ছে এটা এ পর্যন্ত বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত বেগে ওঠা শরণার্থী সঙ্কট। হিউম্যান রাউটস ওয়াচ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে রাখাইনের যে ছবি তুলেছে তা বিশেষণ করে তারা বলছে ২০১৭ এর আগস্টের পর উত্তর রাখাইনে আগুনে সম্পূর্ণ অথবা আংশিক পুড়ে গেছে অন্তত ২৮৮টি গ্রাম। ছবিতে দেখা যাচ্ছে বহু এলাকা যেখানে রোহিঙ্গাদের গ্রাম ছিল সেসব এলাকা পুড়ে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কাছেই রাখাইনের স্থানীয় বৌদ্ধদের গ্রামগুলো অক্ষত রয়েছে।
গত শুক্রবার জাতিসংঘের মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অর্ধেকেরও বেশি কুতুপালং এলাকায় বসবাস করছে। ত্রাণ অংশীদাররা মৌলিক সুবিধা, অবকাঠামো ও সড়ক অভিগম্যতা বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে।
ভয়েস অব আমেরিকা তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, ত্রাণ সংস্থা রিফিউজি ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট এরিক পল শোয়ার্টজ গত মাসে বাংলাদেশ সফর করেন। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই তিনি বলেন, শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বলে ইতিমধ্যে পরিষ্কার যে, রাখাইনে জাতিগত নির্মূল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। নিউইয়র্কে পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক অধিবেশনে তিনি আরো বলেন, প্রায়ই ঘোষণা ও কোনো সতর্কতা ছাড়াই মিয়ানমারের সেনারা বাড়িঘরে আগুনবোমা ছুড়ে মারে। এরপর বেসামরিক লোকজন যখনই পালাতে শুরু করে তারা পদ্ধতিগতভাবে গুলি ছোড়ে। একের পর এক রোহিঙ্গা একই কাহিনী বলছে। তিনি আরো বলেন, যদি একটি দেশ থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে ৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে ঠেলে দিতে চাও তাহলে কী করবে। তাদেরকে এমনভাবে আতংকিত করতে হবে যা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তৈরি করে।
মানবিক সংকট
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অংশীদাররা ক্রমাগত বর্ধমান শরণার্থী জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে কঠোর সংগ্রাম করছে। আগামীকাল সোমবার জেনেভায় আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার সম্মেলন হওয়ার কথা। ওখানে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ১২ লাখ রোহিঙ্গার সহায়তায় ৪৩৪ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
জাতিসংঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে যে মোট রোহিঙ্গা রয়েছে তাদের ৬০ ভাগই শিশু। ভয়াবহ আবাসন পরিস্থিতি ও পানিবাহিত রোগের দরুণ ৩ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গাশিশু স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। ক্যাম্পের ঘিঞ্জি আবহে শিশুরা তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছে না। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে নারী ও শিশুরা দ্রুত অসুস্থ হচ্ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাটি কর্দমাক্ত। ক্যাম্পের পরিবেশ জীবানু বহনের অনুকূলে।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক এন্থনি ব্লেক বলেছেন, শিশুদের জরুরিভিত্তিতে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন এবং টিকাদান সেবা দেওয়া দরকার। ইউনিসেফ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, আগামী ছয়মাসে যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ সহায়তা না পাওয়া যায়, তাহলে বহু নারী, শিশু ও বৃদ্ধা মারা যাবে। বর্তমানে অনেক শিশু অপুষ্টি, পানিশূন্যতা এবং কলেরা এবং ম্যালেরিয়ায়ার মতো সংক্রামক রোগে ভুগছে।
উখিয়া থেকে আমাদের চট্টগ্রাম অফিসের আজহার মাহমুদ জানান,
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলছেন সদ্য গঠিত ‘বার্মায় গণহত্যা ও সন্ত্রাস তদন্তে নাগরিক কমিশনে’র সদস্যরা। গতকাল শনিবার কুতুপালং রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্পে দিনভর তারা রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতণের বর্ণনা শুনেন। আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামসুল হুদা ও বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে চেয়ারম্যান ও সদস্য সচিব করে এই কমিশন গঠিত হয়েছে।
কমিশনের সদস্যরা ইত্তোফাককে জানিয়েছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র তুলে আনতে এই কমিশন শনিবার থেকে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার নির্যাতিত রোহিঙ্গার সাথে কথা বলবেন কমিশনের সদস্যরা। আজ রবিবার কক্সবাজারে সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হবে। পরবর্তীতে আরো বিস্তারিত কার্যক্রম শেষে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর পরিস্থিতি সাপেক্ষে কমিশনের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়েরের পরিকল্পনা রয়েছে।
কমিশনের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বিচারপতি গোলাম রব্বানী, কাজী এবাদুল হক, মমতাজ উদ্দিন আহমদ, নিজামুল হক নাসিম, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুন, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মো. নুরুল আনোয়ার, নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) মো. আবদুর রশিদ, মেজর জেনারেল (অব) মো. আলী সিকদার, শিক্ষাবিদ মমতাজ লতিফ, লেখক সাংবাদিক শাহারিয়ার কবির, আসিফ মুনির, ডা. নুজাহাত চৌধুরী চম্পা, মানবাধিকার কর্মী আরমা দত্ত।
গতকাল তদন্তকাজের সময় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল ইত্তেফাককে বলেন, নাগরিক কমিশনের পক্ষ থেকে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সর্বোচ্চ সংখ্যক রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে তাদের দেশে সংগঠিত নির্যাতনের কথা লিপিবদ্ধ করা হবে।
পরিদর্শনে কানাডিয়ান মন্ত্রী : উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন কানাডার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল ববিস। গতকাল সকালে তিনি শরনার্থী ক্যাম্প, নারী বান্ধব কেন্দ্র, উখিয়া টেকনাফ সড়কের টিভি রিলে কেন্দ্রের পাশে রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির পরিচালনাধীন হাসপাতাল পরিদর্শন করেন।
ইত্তেফাক/নূহু
