মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনযজ্ঞ এখনো চলছে। প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমার ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা চরম মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সারা বিশ্ব মিয়ানমারকে তাগিদ দিচ্ছে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘের থার্ড কমিটি ও মানবাধিকার কাউন্সিলে মিয়ানমার বিরোধী প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। তবে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। চীন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিধর দেশের ভিন্ন অবস্থানের পরও মিয়ানমারকে চাপে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমারকে তাগিদ দিয়েছে।
গত আগস্টের শেষদিকে রাখাইনে মুসলিমদের ওপর সেনাবাহিনীর সহিংস অভিযান শুরুর পর থেকেই এই হামলার নিন্দা জানিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে এর মধ্যে বেশ কয়েক দফা সহিংসতা বন্ধে মিয়ানমারের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে। সেনা অভিযান শুরুর একদিনের মাথায় ২৬ আগস্ট মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হিদার নোয়ার্ট এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীকে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানার আহবান জানান।
IMG0
গত ১৫ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা মুসলিমদের নৃশংসতার ঘটনায় প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। গত ২২ নভেম্বর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো অভিযানকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ বলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। টিলারসন সহিংসতার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহবান জানান। এর এক সপ্তাহ আগেই এক সংক্ষিপ্ত সফরে মিয়ানমার যান টিলারসন। তার সফরের উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সেনাদের চাপ দেওয়া। সর্বশেষ ১৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সদরদপ্তরে তিনি জানান, জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানোর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ওপর টার্গেটেড নিষেধাজ্ঞা আরোপে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে। এর চারদিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের এক জেনারেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
IMG1
মং মং সো নামের ওই সেনা কর্মকর্তা দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় কমান্ডের শীর্ষ পদে নিয়োজিত ছিলেন। রাখাইন প্রদেশ ওই কমান্ডের আওতাধীন। মং সোর নেতৃত্বেই সেখানে নিধনযজ্ঞ চালায় সেনাবাহিনী। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির অভিযোগে আগেই যুক্তরাষ্ট্রের কালো তালিকাভুক্ত ছিলেন এই সেনা কর্মকর্তা। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ মৌখিকভাবে মিয়ানমারকে তিরস্কার করলেও কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। এমনকি মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়নি।
ইতিমধ্যে মার্কিন কংগ্রেসম্যানরা রাখাইনে সহিংসতার জন্য দায়ী সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থবহ পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানিয়েছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট নেতারা যৌথভাবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপে সিনেটে বিল উত্থাপন করেছে। নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকেও যুক্তরাষ্ট্র রাখাইনে নৃশংস অপরাধের নিন্দা জানিয়ে তা বন্ধের আহবান জানিয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘে দেশটির রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালে বলেন, সহিংসতার জন্য মিয়ানমার সেনা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ব্যবস্থা নিতে হবে। মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগে দেশটির কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ রাখার আহবান জানান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল সমর্থন থাকার পরও চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় নিরাপত্তা পরিষদে কোনো প্রস্তাব গৃহীত হয়নি।
IMG2
মিয়ানমারকে শুধু আন্তর্জাতিকভাবে চাপে রাখতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেনি যুক্তরাষ্ট্র বরং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তায় বড় ভূমিকা রেখেছে দেশটি। ২৪ আগস্টের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য ৯ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ সহায়তা দিয়েছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রিশ লাখ প্যাকেট ওরস্যালাইন দিয়েছে দেশটি।
মিয়ানমারের জেনারেলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বার্তা দিচ্ছে যে অন্যায়কারীরা কখনও পার পাবে না।
ইত্তেফাক/এমআর
