প্রভাত ফেরিতে আসা মানুষের স্রোত এসে মিশেছিল বইমেলা প্রাঙ্গণে। অমর একুশে স্মরণে বাংলা একাডেমি আয়োজিত এই বইমেলা বাঙালির কাছে হয়ে উঠেছে একুশের সমার্থক। শহীদ বেদিতে ফুল অর্পণ আর বইমেলায় এসে বই কেনা যেন একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণে সপরিবারে, ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে মা-বাবা, ছোট ভাইবোনকে নিয়ে বড় ভাই-বোন বইমেলা প্রাঙ্গণকে ভরিয়ে তুলেছিলেন।
শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে মেয়ে মালিহাকে নিয়ে বইমেলায় এসেছিলেন চাকরিজীবী আহমদ হোসেন। তিনি বললেন, একুশে ফেব্রুয়ারিতে শুধু শহীদদের স্মরণ করা নয়, যে কারণে তারা আত্মোত্সর্গ করেছেন তার বাস্তবায়ন করাই হবে প্রধান কাজ। আমরা যদি সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়তে ব্যর্থ হই তাহলে ঘটা করে এই স্মরণ বিফল যাবে।
শহীদ মিনারে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো শেষে মানুষের গন্তব্য ছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণ। শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বইমেলা প্রাঙ্গণে মানুষের যে মিছিল শুরু হয়েছিল তা সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আরো বেড়েছে। বিকেলে মেলায় তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। সন্ধ্যার পর মেলায় দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল সবচেয়ে বেশি। সন্ধ্যার পর মানুষের দীর্ঘ সারি।
বইমেলার দ্বার খুলে গিয়েছিল সকাল আটটায়। এদিকে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বজায় রেখে মেলার মূলমঞ্চে শুরু হয়েছিল একুশের প্রভাতের স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। প্রভাত ফেরি শেষে অগণিত দর্শক ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে উপভোগ করেছেন কবিদের কবিতা পাঠ। আসরে সভাপতিত্ব করেন কবি কামাল চৌধুরী। এ আসরে যোগ দিয়েছেন ঢাকা ও আশেপাশের অঞ্চলের শতাধিক কবি।
গতকাল বইমেলায় মানুষের ঢল নামে মূলত সকাল দশটার পরে। সাদাকালো শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরে এসেছিলেন ছেলেমেয়েরা। গালে, কপালে, পোশাকে ছিল বর্ণমালা।
এরপর বেলা যত বেড়েছে মানুষের স্রোত তত বেড়েছে। বইপ্রেমীদের ভিড়ে মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে উঠেছিল জনারণ্য। বইমেলা উপচে মানুষের সেই ভিড় ছড়িয়ে পড়েছিল টিএসসি, শাহবাগ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। গতকাল স্টলগুলোতে বিক্রিও হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ। প্রকাশকদেরও মুখে হাসি।
গতকাল বিকেলে মেলায় এসেছিলেন কথাসাহিত্যিক ও দৈনিক কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক ও বুলবুল সরওয়ার। তারা নিজ নিজ বইয়ের উপর ভক্তদের অটোগ্রাফ দেন।
সকালের চিত্রটাও ছিল একইরকম। একুশে ফেব্রুয়ারিতে গতকাল মেলার দ্বার খোলা হয় সকাল আটটায় এবং দ্বার বন্ধ করা হয় রাত নয়টায়। দ্বার খোলার পর থেকেই মেলার দুই প্রাঙ্গণে ভিড় করে অগণিত বইপ্রেমীরা।
এদিকে, গতকাল শহিদ দিবসে রাফিয়া আহমেদের কাব্যগ্রন্থ ‘চাতক প্রেম’ মেলায় এসেছে। বইটি প্রকাশ করেছে পার্ল পাবলিকেশন্স। রাফিয়া বললেন, প্রথম বই প্রকাশ হওয়া যেন, প্রথম প্রেমের মতো; সে অনুভূতি বলে বোঝানো যাবে না।
নতুন বই
বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মেলার ২১তম দিনে নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে ৩৯০টি। এর মধ্যে অন্যপ্রকাশ এনেছে সৈয়দ শামসুল হকের নতুন উপন্যাস ‘নদী কারো নয়’, ঐতিহ্য এনেছে সাইফুর রহমানের গল্পগ্রন্থ ‘পক্ষিরাজের ডানা’, বইপত্র থেকে এসেছে মুহাম্মদ সেলিমের ‘জঙ্গিবাদ ও সমকালীন বাংলাদেশ’, মেলা এনেছে আমজাদ হোসেইনের ‘হীরামন বসতি’, জ্ঞানকোষ এনেছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘বিগ ব্যাং থেকে হোপো স্যাপিয়েনস’।
মেলামঞ্চে অনুষ্ঠান
গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়- অমর একুশে বক্তৃতা। একুশে ফেব্রুয়ারির লক্ষ্য কী, অর্জনের পথ কোন দিকে শীর্ষক বক্তৃতা প্রদান করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন শামসুজ্জামান খান। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, একুশের পথ বেয়ে একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশ করলেও বাংলাকে আমরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। এই অবস্থার মূলে রয়েছে আমাদের রাজনৈতিক সংকট। শ্রেণিবৈষম্যের অবসান না ঘটায় সমাজে দারিদ্র্য, শোষণ ও নির্যাতন ঔপনিবেশিক সময়ের মতোই ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থার নিরসনকল্পে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির যে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার প্রয়োজন ছিল তার অনপুস্থিতি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সাম্যবাদী সংকল্পের বাস্তবায়নকে সুদূরপরাহত করেছে।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পথপরিক্রমায় আমাদের রাজনীতি বিভাজিত ছিল নানা ধারা-উপধারায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেটি আরো স্পষ্ট হয়। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধকালে বামপন্থীদের একটি অংশ স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। একুশ থেকে একাত্তর- এই উত্তাল কালপর্বে বিভাজনের উর্ধ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতাই প্রধান সত্য হয়ে দেখা দিয়েছে।
শামসুজ্জামান খান বলেন, একুশে শহীদদের শোককে বাঙালি শক্তিতে পরিণত করেছে। ভাষা আন্দোলনের অমর চেতনার পথ ধরে আমরা এগিয়েছি স্বাধীনতার দিকে।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ফকির সিরাজের পরিচালনায় ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী’-এর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী ফকির আলমগীর, কল্যাণী ঘোষ, ফিরোজ আহমেদ, আবদুল হালিম খান।
ইত্তেফাক/নূহু
