রাউজানের শোকাবহ কালো অধ্যায় হলো '১৩ এপ্রিল'

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৮, ১৩:১১
১৩ এপ্রিল ১৯৭১। রাউজানের শোকাবহ এক ভয়ঙ্কর দিন। সেদিন এদেশের পাকিস্তানি দোসরদের সহযোগিতায় হানাদার বাহিনীরা পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে উপজেলার তেরটি স্থানে সকাল সাতটা থেকে শুরু করে নির্মম ও নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। রাউজানের ইতিহাসের সেই নারকীয় গণহত্যায় ১৫৬জন হিন্দু ও ১০ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়। আজ ১৩ এপ্রিল দিবসটি পালনে নানা কর্মসূচী হতে নিয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগ। এছাড়াও স্থানীয় পর্যায়ে কুণ্ডেশ্বরী এবং পাহাড়তলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ঊনসত্তরপাড়া বধ্যভূমি স্থলে দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করলেও উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন তেমন কোন উদ্যোগ নেয়নি।
 
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় রাউজান উপজেলার প্রায় ৬টি স্থানে  গঠিত হয় মুক্তিসেনা সংগ্রহ ও সহায়ক কমিটি। এ সব কমিটিগুলোর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়প্রদানকারী, পথ প্রদর্শনকারী ও যোগাযোগ রক্ষাকারীরা এক সূত্রে গাঁথা ছিল। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতে গমন, ট্রেনিং শেষে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে যথাস্থানে পৌছাতে সহায়তা করেছিল।  ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা বাঙালি নিধনে লিপ্ত হলে এদেশে তাদের তাদের দোসররা রাউজানে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতাকারী ও হিন্দু নিধনের নীল নকশা বাস্তবায়ন করতে মত্ত থাকে।
 
২০১২ সালে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানবতার বিরোধী অপরাধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে দায়েরকৃত মামলার অভিযোগের সূত্রে জানা যায়, সেদিন বহু সংখ্যক হানাদার বাহিনী তাদের দোসরদের সহযোগিতায় সর্বপ্রথম মধ্য গহিরার শীলপাড়ায় গণহত্যা চালায়। এখান তারা পাঁচজন হিন্দুকে হত্যা করে। সেখান থেকে গহিরা হাইস্কুলের পাশ দিয়ে বিশ্বাস বাড়িতে হামলা করে ৩জন হিন্দুকে হত্যা করে। সেখান থেকে মাইল খানেক পূর্বে রাস্তার পাশে বড়পোল পালিত পাড়ায় প্রবেশ করে ৮ জন হিন্দুকে জড়ো করে হত্যা করা হয়। নিজ বাড়িতে স্থাপিত কুণ্ডেশ্বরী মাতৃমন্দিরে প্রার্থনারত অবস্থায় পাকসেনাদের গুলিতে মারা যান অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহ। এই দিন পূর্ব গহিরার বৈদ্যবাড়ি ও চৌধুরী বাড়িতে প্রায় ১০০ জন নরনারীকে হাত পা বেঁধে বেধড়ক মারপিট করে, বাড়ি লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে। রাস্তার পাশে বাড়ুই পাড়া গ্রামে ৪ জনকে হত্যা করে। জগৎমল্ল পাড়া ঘেরাও করে অগ্নিসংযোগে নির্বিচারে গুলি করে ৩৬ জন হিন্দুকে হত্যা করা হয়। এছাড়া বণিকপাড়ায় ১১ জন, সুলতানপুর ছিটিয়া পাড়ায় ৯ জন, রাউজান পালিতপাড়ায় ১ জনকেহত্যা করা হয়।
 
সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় পাহাড়তলী ইউনিয়নের ঊনসত্তর পাড়ায়। এখানে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শরণার্থীরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই জায়গায় পাক সেনারা চরম তাণ্ডব চালিয়ে ৬৮ জন কে হত্যা করেছিল। এই দিন ইমাম গাজ্জালী কলেজ গেট সম্মুখে কাপ্তাই সড়কে পাকসেনাদের ব্রাশ ফায়রের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলে ৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তৎমধ্যে ছিলেন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ ছেলে ছাত্র নেতা সাইফুদ্দিন চৌধুরী খালেদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সম্পাদক আব্দুর রউফ, কানুনগোপাড়া কলেজের অধ্যাপক দিলিপ চৌধুরী প্রমুখ। এদের মধ্যে একমাত্র জীবিত ছিলেন তৎকালীন ছাত্র নেতা বাশঁখালীর সাবেক এমপি সুলতানুল কবির। সকালে সত্তার ঘাট দিয়ে হানাদার বাহিনীরা প্রবেশ করে উল্লেখিত স্থানগুলোতে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে শহরে যাওয়ার পথে  নোয়াপাড়া প্রবেশ করে ৩ জন মুসলমান ও ৯ জন হিন্দুকে হত্যা করে।
 
জানা যায়, সেদিন এ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর থেকে রাউজানের ব্যাপক সংখ্যক হিন্দু ভারতে শরণার্থী হয়ে অবর্ণনীয় কষ্টের সম্মুখীন হয়। হত্যার এমন নির্মমতা ছিল যে, অনেক পরিবারের মধ্যে কেউই বেঁচে নেই। এদের নৃশংসতা ও হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পায়নি পাঁচ বছরের শিশু হতে আশি বছরের বৃদ্ধ। নিরপরাধ, নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষগুলোর উপর এমন নৃশংসতা, বর্বরতা যেন হিটলারের বর্বরতাকেও সেদিন হার মেনেছিল।
 
রাউজানে গণহত্যা দিবস পালন উপলক্ষে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও পৌর প্যানেল মেয়র বশির উদ্দিন খান দৈনিক ইত্তেফাককে জানান, ১৩ এপ্রিল গণহত্যা দিবস পালনে উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ যৌথভাবে নানা কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। তবে এই দিবসটি পালনে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করেনি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন এবং উপজেলা প্রশাসন। এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন রেজা দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, উপজেলা প্রশাসন হতে এই দিবস নিয়ে কোন প্রোগ্রাম হবে না। আমার উপর কোন সরকারি নির্দেশনা আসেনি। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে লিখিত ইতিহাস চেয়েছি ওরা দিতে পারেনি।এই বিষয়টি আমি পর্যবেক্ষণে রাখছি। মুক্তিযোদ্ধাদের এবারের কর্মসূচী দেখে মনে হয় যে আমার করা উচিত, তাহলে আগামীবার থেকে করবো।
 
এই ব্যাপারে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবু জাফর চৌধুরী জানতে চাইলে তিনি দৈনিক ইত্তেফাককে জানান কুণ্ডেশ্বরীতে গণহত্যা দিবস পালন করা হবে। তবে তাদের কোন কর্মসূচী নেই। এছাড়া উপজেলা বধ্যভূমির সংখ্যা, অরক্ষিত ও সংরক্ষিত সংখ্যা নিয়ে কোন সঠিক তথ্য দিতে পারেনি। তবে জানা যায় কুণ্ডেশ্বরীতে পারিবারিকভাবে অধ্যক্ষ নূতন চন্দ্র সিংহের মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হবে।
 
ইত্তেফাক/এসএস