হাওরে এবার ধানের বাম্পার ফলন

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০১৮, ০৯:৫৩
নেত্রকোনার হাওরগুলোতে এবার বোরো ধান কাটার হিড়িক বা মহোত্সব পড়ে গেছে। শুধু ব্রি-২৮ নয়, এখন ব্রি-২৯ ধানও কাটা শুরু হয়ে গেছে। অথচ গত বছর আগাম বন্যায় হাওর উপজেলাগুলোর সকল ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পচে গিয়েছিল। কিন্তু এবার হাওর উপজেলাগুলোতে সেই দুঃশ্চিন্তা নেই। আর ১৩ দিনের মধ্যে সকল ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে বলে কৃষকরা জানায়।
 
 
এদিকে হাওর উপজেলাগুলোতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে যে, ধান কাটা শ্রমিকের অভাব রয়েছে। জেলার বাইরে থেকে শ্রমিক এনে ধান কাটানো হচ্ছে। এতে করে বাড়তি খরচও হচ্ছে বলে কৃষকরা জানান। অপরদিকে ধানের দাম  কৃষকরা পাচ্ছেন না। বর্তমানে কাঁচা ধান প্রতিমণ   ৬শ টাকা থেকে ৬২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।
 
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিলাশ চন্দ্র পালের মতে ‘এবার চালের দাম আর বাড়বে না। কারণ ধান উত্পাদনে উদ্বৃত্ত জেলা নেত্রকোনা। জেলার খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে ধান ব্যবসায়ীরা সারা দেশে এই ধান নিয়ে যায় বিক্রির জন্য’। এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবাহী প্রকৌশলী মো. আক্তারুজ্জামান এই প্রতিবেদককে বলেন, এবার আগাম বন্যা এলেও ধানের তেমন ক্ষতি হবে না। কারণ ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। বাঁধগুলোও মজবুত করে নির্মাণ করা হয়। তিনি আরো বলেন, বন্যার আগাম হুমকি থেকে ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এক  হাজার কোটি টাকার বোরো ফসল রক্ষা করা হয়েছে।
 
সালেমা কৃষাণী বলেন, ‘হাছিনা খাইল্যাজড়ি আইয়া কইয়া গেছিল, আমরারে বাঁধ বানাইয়া দিব, দিছেও। টেহার কারণে গতবার ছেড়িডারে বিয়া দিতে পারছি না। এইবার ধান অওনে ছেড়িডার বিয়াও দিতাম পারবাম’।
 
ছাতক সংবাদদাতা, আব্দুল আলিম জানান, সুনামগঞ্জের ছাতকে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। ধান কাটাকে কেন্দ্র করে কিষাণ-কিষাণীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে হাওরাঞ্চল ও গ্রামীণ জনপদ। চলছে ধান কাটার উত্সব। গত বছর এমন সময় বিষাদে তিক্ত ছিল হাওর পাড়ের মানুষের জীবন।
 
কর্ম ব্যস্ততায় এখন হাওরে-হাওরে বইছে বাংলার সেই চিরাচরিত রূপ। একদিকে বাম্পার ফলন অন্যদিকে ফসল হারানোর সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাওয়ায় কৃষকরা ধান কাটা, মাড়াই-ঝাড়াই ও ধান গোলায় তোলার কাজে এতটুকু সময় নষ্ট করতে নারাজ। টানা দু’বছর বোরো ফসল হারা কৃষকরা এখন আর পেছনে ফিরতে চায় না। উপজেলার প্রত্যেকটি হাওরে এখন বোরো ফসল কাটার ধুম পড়েছে।
 
চলতি মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় উপজেলার নাইন্দা, ডেকা ও চাউলীর হাওরে ৭টি পিআইসি গঠনের মাধ্যমে আগাম ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করায় কৃষকরা অনেকটা স্বস্তিতে ছিল। উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে এখানে বোরো চাষাবাদের লক্ষ্য মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ১৩ হাজার ৭৯৮ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে উপশী ধান চাষ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৭৬৮ হেক্টর, হাইব্রিড চাষ করা হয়েছে ৮৮০ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের টেপু, গর্চি, গাছমাল চাষাবাদ করা হয়েছে ১৫০ হেক্টর জমিতে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কেএম বদরুল হক জানান, চলতি মৌসুমে বোরোর ফলন খুবই ভাল হয়েছে।
 
উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়েছে কৃষকদের। ঘন-ঘন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের আরো দক্ষ ও সচেতন করা হয়েছে। এক বিঘা জমি চাষাবাদের জন্য কৃষি পুনর্বাসনের আওতায় উপজেলার ১৮ হাজার ৭৬৬ জন কৃষককে বীজ, সার ও নগদ ১ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে।
 
চলতি মৌসুমে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের উপর সরকারের কঠোর নজরদারী থাকায় বাঁধগুলোর অবস্থা ভাল রয়েছে। আগাম বন্যায় ফসলহানীর সম্ভাবনা অনেকটাই কেটে গেছে। উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা আব্দুল হামিদ জানান, ১৩-১৪ দিনের মধ্যে কৃষকরা ফসল ঘরে তুলতে পারবে। কৃষক আজাদ মিয়া, হাজী আব্দুল খালিক, আরজু মিয়া, জালাল উদ্দিন জানান, আগাম জাতের ফসল ভালো হলেও এ বছর ধানে এক-তৃতীয়াংশ চিটা রয়েছে।