ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বাড়বকুণ্ড বাজার থেকে পশ্চিম দিকে কিছুটা পথ পেরোলেই মান্দারীটোলা গ্রাম। এরপর সমুদ্রের দিকে আরো খানিকটা এগিয়ে গেলে নডালিয়া গ্রাম। এক সময় দুটি গ্রামেই ছিল সবুজের সমারোহ। গাছে গাছে পাখি ডাকত। উর্বর জমিতে ফসল ফলাত কৃষক। খাল, জলাশয়ে জেলেরা মাছ শিকার করত। রাখাল ছেলেরা সাগরের পাড়ে বেড়িবাঁধে গিয়ে গবাদি পশু চরাত আর মনের আনন্দে গান গাইত। কিন্তু মান্দারীটোলা ও নডালিয়া গ্রামের সেই চিরচেনা পরিবেশ আর নেই। গ্রামের মানুষ এখন আর শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। তাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে ১১টি এলপি গ্যাস কারখানা। যে কোনো সময় এসব কারখানায় ঘটতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়, যার ফলে অসংখ্য মানুষ মারা যেতে পারে, ধ্বংস হতে পারে মূল্যবান সম্পত্তি। তাই প্রাণঘাতী বিপদের আশঙ্কা সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায় গ্রাম দুটির ৩০ হাজার মানুষকে।
জানা গেছে, ইতোমধ্যেই গ্রাম দুটিতে এলপি গ্যাস বোতলজাত করার অনুমতি পেয়েছে বিএম এনার্জি লিমিটেড, ইউনিভার্সেল এলপিজি লিমিটেড, ইউরো গ্যাস, জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস, সিনার্জি পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, রয়েল এলপিজি লিমিটেড, এসকিউ এলপি গ্যাস লিমিটেড, ক্যাপিটাল এলপি গ্যাস লিমিটেড, বে এলপি গ্যাস লিমিটেড, অর্কিড এলপি গ্যাস ও ক্রিস্টাল এলপিজি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে জেএমআই সিলিন্ডার লিমিটেড নামে আরো একটি প্রতিষ্ঠানকে কারখানা স্থাপনের জন্য অবস্থানগত ছাড়পত্র দিয়েছে পরিবেশ অধিদফতর। এ কারখানায় এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার তৈরি করা হবে। তবে সর্বশেষ অনুমতি পাওয়া এ কারখানাটি নিয়ে গ্রামবাসীর মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। কারণ কারখানাটি নির্মিত হচ্ছে মান্দারীটোলা গ্রামের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়। গত বুধবার সরেজমিনে গ্রামটি পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, ইতোমধ্যে কারখানার বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে সামনের খালে বক্স কালভার্ট নির্মাণের কাজ। গ্রামবাসী অভিযোগ করেছেন, জেএমআই কর্তৃপক্ষ সরকারি খালের ওপর বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করেছে। এতে করে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। গ্রামবাসী আরো বলেন, সিলিন্ডার তৈরির এ কারখানাটিতে উত্পাদন শুরু হলে এলাকায় চরম পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণে জীবন ও সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। কারখানাটিতে ইস্পাত কাটা, ঝালাই, পরিবহন ইত্যাদি কাজের জন্য শব্দদূষণ মাত্রা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাবে। হিট ট্রিটমেন্ট ওভেন এবং ৫০ ফুট উচ্চতার চিমনির বর্জ্য ও ডাস্ট জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করবে। চিমনির বর্জ্যের কারণে জমির ফসল এবং বৃক্ষের ফলফলাদি নষ্ট হবে। জানা গেছে, দেশের চিংড়ি ঘেরের উল্লেখযোগ্য অংশ ওই এলাকা থেকে সংগৃহীত হয়। কারখানা থেকে নিঃসৃত বর্জ্যের কারণে পার্শ্ববর্তী খালে সামুদ্রিক মাছ ও মূল্যবান চিংড়ির রেণু আসা সম্পূর্ণ বন্ধ হবে। স্থানীয়রা উক্ত কারখানার অবস্থানগত সনদ বাতিলের পাশাপাশি অবিলম্বে কারখানা নির্মাণ কাজ বন্ধ করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
বাড়বকুণ্ড ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জামাল উল্লাহ ইত্তেফাককে জানান, এলপি গ্যাস কারখানা আমাদের জীবনের শান্তি কেড়ে নিয়েছে। শত শত কৃষক জমি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। বিভিন্ন ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও গত ফেব্রুয়ারি মাসে জেএমআই গ্রুপকে সিলিন্ডার কারখানা নির্মাণের পরিবেশ ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। কারখানাটি নির্মিত হচ্ছে একেবারে গ্রামের মাঝখানে। আগের যেসব কারখানা অনুমতি পেয়েছে তাদের অবস্থান লোকালয় থেকে দূরে হওয়ায় সেগুলো নিয়ে গ্রামবাসীর তেমন উদ্বেগ ছিল না। কিন্তু বর্তমান কারখানাটি একেবারে লোকালয়ের মধ্যে হওয়ায় আমাদের সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেএমআই সিলিন্ডার লিমিটেডের কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইত্তেফাককে বলেন, আমরা পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় কারখানা স্থাপন করছি। জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা ইত্তেফাককে বলেন, গ্রামের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা বা পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন স্থানে শিল্প কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয় না।
ইত্তেফাক/নূহু
