চান্দিনায় এক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই নবাজাতকের মৃত্যু

আপডেট : ০৪ মে ২০১৮, ১৫:৫০
কুমিল্লার চান্দিনায় এক ভুয়া গাইনি ডাক্তারের অপচিকিৎসায় একই দিনে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই নবাজাতকের মৃত্যু ঘটেছে। বৃহস্পতিবার উপজেলার নবাবপুর বাজারে ‘নবাবপুর মেডিকেল সেন্টার’ নামে একটি ক্লিনিকে এ ঘটনা ঘটে। তবে দোকান ঘরে ওই নামে সাইন বোর্ড থাকলেও কথিত ডাক্তার এর চিকিৎসাপত্রে ‘নাহার কন্সালটেশন সেন্টার’ নাম রয়েছে।
 
এ ঘটনায় বিক্ষুদ্ধ জনতা ওই ক্লিনিকে ভাংচুর চালায়। খবর পেয়ে চান্দিনা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নিহত দুই নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করে এবং ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে ভুয়া গাইনি ডাক্তার কামরুন্নাহারের সহযোগি ইয়াসমিনকে (৩৫) আটক করে।
 
নিহত নবজাতকরা হলো- উপজেলার বিচুন্দাইর-করইয়ারপাড়া গ্রামের প্রবাসী সফিকুল ইসলামের ছেলে সন্তান এবং কংগাই গ্রামের ওমর ফারুকের ছেলে।
 
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার জোয়াগ ইউনিয়নের কৈলাইন গ্রামের ডিপ্লোমা চিকিৎসক খলিলুর রহমান পলাশ কামরুন্নাহার নামে এক নার্সকে বিয়ে করে প্রায় ১০ বছর আগে নবাবপুর বাজারের একটি দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে ক্লিনিক চালু করেন। ওই ক্লিনিকে তার স্ত্রীকে গাইনি ডাক্তার হিসেবে সকলের কাছে পরিচয় করান। দুইজনেই এলাকায় চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছিলেন। প্রায় ৪ বছর আগে খলিলুর রহমানের সাথে কামরুন্নাহারের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলেও ওই ক্লিনিক ছাড়েননি কথিত ওই ডাক্তার কামরুন্নাহার।
 
দোকান ঘরের সার্টারে ‘নবাবপুর মেডিকেল সেন্টার’ নামে সাইনবোর্ডের ডা. খলিলুর রহমানের নাম থাকলেও বিবাহ বিচ্ছেদের পর তার স্ত্রী কামরুন্নাহার নিজের নামে চিকিৎসাপত্রে ‘নাহার কন্সালটেশন সেন্টার’ এবং নিজের নাম ‘ডা. আরএ কামরুন্নাহার’ লিখে চিকিৎসাপত্র ছাপান। ওই চিকিৎসা পত্রে কামরুন্নাহার নিজের নামের পাশে ‘সনোলজিস্ট, মেডিসিন, মা ও শিশু, গাইনি, প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ’ বলে উল্লেখ করেন।
 
সেখানে তিনি গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, অকাল গর্ভপাত, নরমাল ডেলিভারি, সিজার ডেলিভারিসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সেবা চালিয়ে আসছিল।
 
ওমর ফারুক বলেন, আমার স্ত্রী প্রথম সন্তানধারণ করার পর এলাকার লোকমুখে ডাক্তার কামরুন্নাহারের নাম শুনে তারা কাছে প্রায়ই নিয়ে আসতাম। বুধবার বিকেলেও তিনি (কথিত ডাক্তার কামরুন্নাহার) আমার স্ত্রীর আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে বলেন আগামী দিন সকালে আমার স্ত্রীকে নিয়ে আসতে। তার কথামত আমি বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে তার চেম্বারে নিয়ে আসি। সেখানে আনার পর তিনি আমার স্ত্রীকে ইজেকশন ও স্যালাইন দেয়। বিকেল অনুমান ৫টার দিকে আমার ছেলে সন্তান হয়েছে বলে আমাকে জানান। কিছুক্ষণ পর আবারও জানান, আমার স্ত্রীর সাইড সিজারে সন্তান ডেলিভারি হওয়ায় আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং আমার সন্তান মারা গেছে।
 
নিহত অপর শিশুর খালা কুলসুমা বলেন, আমার ছোট বোনের প্রসব ব্যথা শুরু হলে সকাল ৯টায় আমরা কামরুন্নাহার ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে আসি। দুপুর ২টার দিকে আমার বোনের সন্তান প্রসব হওয়ার পর থেকে শিশুটির শরীর ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। বিষয়টি আমার তাকে (কামরুন্নাহারকে) জানাইলে তিনি বলেন, ‘আমি ডাক্তার না আপনরা ডাক্তার।’
 
বিকেল ৪টার দিকে তিনি আমাদের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘এই ইনজেকশনটি নিয়ে আসেন, বাচ্চার অবস্থা ভালো না। ইনজেকশনটি শিশুটির শরীরে প্রবেশ করার কিছুক্ষণের মধ্যে মৃত্যু ঘটে তার।'
 
মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে দুইটি বাচ্চার মৃত্যুর পর কামরুন্নাহার বলেন, ‘আমি একটু বাজার থেকে আসছি। আপনারা থাকেন’ এই কথা বলেই তিনি পালিয়ে যান।পরবর্তীতে কথিত ওই চিকিৎসক কামরুন্নাহারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
 
এ ব্যাপারে চান্দিনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আলী মাহমুদ জানান, ঘটনাটি শুনে আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুটি নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করেছি। কথিত ডাক্তার কামরুন্নাহার আত্মগোপন করায় তাকে পাওয়া যায়নি তবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তার সহযোগিকে আটক করেছি। এ ঘটনায় নিহত শিশুদের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও কেউ কোন অভিযোগ দেয়নি। তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
 
এ ব্যাপারে চান্দিনা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাছিমা আক্তারের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি। তবে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মুজিব রাহমান বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমার আগে জানা ছিল না। এখন যেহেতু জেনেছি, ভুয়া চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করব।
 
ইত্তেফাক/আরকেজি